শিশুটির মা জানান, জন্মের ৬ মাস বয়স থেকে প্রথমে ঠান্ডাজনিত সমস্যা শুরু হয়। আর সেই ঠান্ডা থেকেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। ধীরে ধীরে তা ফুসফুসে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এর পর থেকেই চিকিৎসা চলছে। এই হাসপাতালেই বেশ কয়েকবার ভর্তি হয়েছি। মেয়ের চিকিৎসার পিছনে আমার জমানো টাকা জমি-জমা গহনা যা ছিল সব শেষ হয়ে হয়ে গেছে। এখন ধার দেনা করে কোনরকমভাবে খরচ যোগাড় করছি। আমার বাচ্চার নিউমোনিয়ার টিকা দিয়েছি তবুও এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। আমরা যেখানে থাকি অনেক জুতা ও পোশাকের কারখানা রয়েছে বলে জানান তিনি। টিকা নেওয়ার পরও দুই বছর বয়স থেকেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত বলেও জানান হাসপাতালে ভর্তি শিশু আফিফার বাবা জনি মিয়া। তিনি বলেন, প্রতি শীতেই ওর কষ্ট বেড়ে যায়। এবার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যাওয়ায় আমরা ওকে নিয়ে এখানে আসি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শীত আসার আগেই নিউমোনিয়া রোগী বাড়তে থাকায় ১৯ শয্যার এই ওয়ার্ডটি এরই মধ্যে পূর্ণ হয়ে গেছে। আর ভর্তি হওয়া প্রায় সর রোগীরই একই অবস্থা। কেউ এক মাস, কেউবা দুইমাস কিংবা তার চেয়ে বেশি দিন ধরে তাদের বাচ্চাকে নিয়ে ভর্তি রয়েছে। তাদের প্রায় সব শিশুই নিউমোনিয়ার টিকা নিয়েছেন। আর দীর্ঘদিন চিকিৎসায় করায় পরিবার চিকিৎসার খরচ যোগাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে। আর্থিক অনটনের কারণে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে পরিবারগুলো।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) তথ্যমতে, প্রতিবছর দেশে কমপক্ষে ২৪ হাজার ৩০০ জন শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায়। এর মধ্যে প্রতি ঘণ্টায় দুই থেকে তিনজন শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায়। আর ছয় লাখ ৭৭ হাজার শিশু নিউমোনিয়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। শিশুদের ৫২ শতাংশই মারা যাচ্ছে বাড়িতে এবং কোনো ধরনের চিকিৎসা না পেয়েই। আক্রান্তদের মারাত্মক নিউমোনিয়ায় ভোগা ৪২ ভাগের রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি (হাইপক্সেমিয়া) থাকে। যা এ রোগের এতো মৃত্যুর বড় কারণ। পাঁচ বছরের কম বয়সিদের শতকরা ২৮ ভাগ মৃত্যুর কারণ এই নিউমোনিয়া।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তথ্য অনুযায়ী, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বিশ্বে প্রতিবছর ৯৩ লাখ ৫০ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়। নিউমোনিয়ার ঝুঁকিতে থাকা দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘটে বায়ুদূষণের কারণে।
সংস্থাটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ৯৫ শতাংশ হাসপাতালে নিউমোনিয়া চিকিৎসার সুব্যবস্থাপনা নেই। যে কারণে ফুসফুস সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৪২ শতাংশ চিকিৎসা নেওয়ার জন্য নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেওয়া হয়। অন্য কোনো চিকিৎসা সেবা না থাকায় ৩৪ শতাংশ শিশুকে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ দেওয়া হয়। অভিভাবকদের অসেচতনতা এবং সরকারি হাসপাতালে অক্সিজেন মাপার যন্ত্রসহ নানা সংকটে দেশে পাঁচ বছর ধরে মৃত্যুর হার প্রায় একই।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) যৌথভাবে এই গবেষণায় দেখা গেছে, সেরোটাইপের ধরন পাল্টে যাওয়ায় প্রচলিত নিউমোনিয়ার টিকা পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের পুরোপুরি সুরক্ষা দিতে পারছে না। দেশের চারটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সেবা নিতে আসা শিশুদের মধ্যে গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে, স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিউমোনি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ এবং এর বিদ্যমান সেরোটাইপগুলো পাওয়া গেছে। আর বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় ২০১৫ সাল থেকে নিউমোনিয়া প্রতিরোধে যে পিসিভি-১০ টিকা দেওয়া হচ্ছে। এই পিসিভি-১০ ভ্যাকসিন শিশুদের কিছু নির্দিষ্ট সেরোটাইপজনিত রোগ থেকে সুরক্ষা দিলেও সময়ের সাথে নিউমোকক্কাস ব্যাকটেরিয়ার ধরনে পরিবর্তন ঘটেছে। গবেষণা বলা হয়, সেরোটাইপের প্রকোপ কমলেও নতুন সেরোটাইপের সংক্রমণ বেড়েছে।
তাই নতুন সেরোটাইপের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষার জন্য নিউমোনিয়া প্রতিরোধে নতুন প্রজন্মের অধিক কার্যকর নিউমোকক্কাল কনজুগেট ভ্যাকসিন (পিসিভি) চালুর আহ্বান স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নিউমোনিয়া এখনও শিশু মৃত্যুর প্রধান কারণ। বেশ কিছু কারণে নিউমোনিয়া আক্রান্ত কমানো যাচ্ছে না। প্রথমত, ভাইরাসের ধরন অনুযায়ী নতুন টিকা না দেওয়া, বায়ুদূষণ এবং আবদ্ধ ঘরে রান্নার ধোঁয়া। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে প্রতিবছরই এই হার বাড়ছে। তাই প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এখন জরুরি।
আইসিডিআরবি দেওয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর পাঁচ বছরের কম বয়সি ৮০ হাজারের মতো শিশু ভাইরাল নিউমোনিয়ায় ও বিভিন্ন ধরনের রেসপিরেটরি সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়।
কিন্তু টিকা নেওয়ার পরও কেন শিশুরা নিউমোনিয়ায় হচ্ছেন এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শত বছর ধরে এ রোগের জন্য দায়ী ছিল ‘নিউমোকক্কাল ও হিমোফিলাস’ ভাইরাস। কিন্তু বর্তমানে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে ‘রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস’ (আরএসভি) নামে নতুন ধরনে। এখন পর্যন্ত যার কোনো কার্যকর টিকা নেই।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, নিউমোনিয়া হল এক ধরণের ফুসফুসের প্রদাহ। আমাদের ফুসফুসের আলভিওলি বা ছোট ছোট বায়ু থলিতে জীবাণুর সংক্রমণের ফলে এই প্রদাহের সৃষ্টি হয়। বিশেষত শীতকালে শিশু এবং বয়স্কদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যু হার প্রায় ১৪ থেকে ৩০ শতাংশ। নিউমোনিয়া নিয়ে ব্যাপক হারে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে বহু শিশুর প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। পাশাপাশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুর যথাযথ চিকিৎসায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে শহরে ভাল চিকিৎসার ব্যবস্থার থাকলেও রাজধানীর বাইরের জেলা শহরগুলোর অবস্থা খুবই অপ্রতুল।আর আমাদের হাসপাতালে নিউমোনিয়ার রোগীর অধিকাংশই শহরের বাইরে থেকে আসা। তারা খারাপ অবস্থা নিয়েই আসছে, ফলে সুস্থ হয়ে ফেরা কঠিন। এ কারণে মৃত্যুর বড় স্থানীয় পর্যায়ের রোগী। আক্রান্ত হওয়ার পর পরই যারা নিকটবর্তী হাসপাতালে যেতে পারছে, তারা সুস্থ হচ্ছে। আবার অবস্থা ক্রমাগত খারাপ হলে চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হোন অভিভাবকেরা। কিন্তু শিশুর হাইপক্সেমিয়া (অক্সিজেনের ঘাটতি) প্রতিরোধ করার মতো ব্যবস্থাপনা উপজেলা হাসপাতালে খুব একটা নেই। শেষে হাসপাতালে পৌঁছালেও রোগীর তুলনায় শয্যা না থাকায় এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে হয়। এতে করে চিকিৎসা শুরুর আগেই চলে যায় নিউমোনিয়ার রোগী।
টিকা দেওয়ার পরও কেন নিউমোনিয়ার আক্রান্তের কেন কমছে এ প্রসঙ্গে আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য ডা. আহমেদ এহসানুর রহমান বলেন, মিউটেশনের কারেেণ নতুন ভাইরাস অনেক ধরনের জীবাণু তৈরি করছে। আর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ছত্রাকের কারণে বিভিন্ন জীবাণুর কারণে নিউমোনিয়া হতে পারে। এর মধ্যে কিন্তু বর্তমানে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে ‘রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস’ (আরএসভি) নামে নতুন ধরনের ভাইরাসে। নিউমোনিয়া কোন জীবাণু দ্বারা হচ্ছে সেটির ৫০ শতাংশই এখনও অজানা। সেটি কি ভাইরাসের মাধ্যমে হচ্ছে, নাকি ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে তাও জানা নেই। যদিও ভাইরাসের কারণে সাধারণত প্রায় একতৃতীয়াংশ নিউমোনিয়ার সংক্রমণ হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, টিকা দেওয়া তা শতভাগ কাজ করছে না। আর বিশ্বে কোন টিকাই শতভাগ কাজ করে না। এজন্যই মনে হচ্ছে টিকা দেওয়ার পরও কেন নিউমোয়ায়।
তিনি বলেন, আমাদের দীর্ঘদিন ধরে দেশে হিব-পিসিভি টিকা দেওয়া হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এগুলো শুধুমাত্র নিউমোকক্কাল ও হিমোফিলাস ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর। বর্তমানে যে আরএসভি ভাইরাসটি বেশি সক্রিয় তার জন্য কোনো টিকা এখনও ইপিআই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বিশ্বে এ টিকার গবেষণাও পরীক্ষা-নিরীক্ষার শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
প্রখ্যাত শিশু রোগ ও নবজাতক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লা বলেন, নিউমোনিয়া শুধু এক কারণে হয়না। অনেকগুলো কারণেই তা হতে পারে। এর মধ্যে ভাইরাস এক জিনিস আবার ব্যাকটেরিয়া আরেক জিনিস। আমাদের দেশে নিউমোনিয়ার যে টিকাগুলো দেওয়া হচ্ছে তা কিন্তু শতভাগ কাজ করবে না। যেমন ২৫ ধরনের ব্যাকটেরিয়া আছে। এখন যে টিকা দেওয়া হচ্ছে তার বিরুদ্ধে ১৫ ধরনের ব্যাকটেরিয়াগুলো কাজ করছে। কিন্তু ১০ ধরনের ভাইরাসে কাজ করছে না। এই কাজ না করার পেছনে ব্যাকটেরিয়াগুলো পুরোপুরি ধ্বংস না হয়ে উল্টো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্সের কারণে ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে ওই অ্যান্টিবায়োটিক ঠিকভাবে কাজ করছে না। তাই টিকা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করে কিন্তু অনেকে সময় দেখা যাচ্ছে ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও নিউমোনিয়া হতে পারে।