মাইলস্টোন স্কুলে বিমান বিধ্বস্ত: মৃত‍্যুকে জয় করে ঘরে ফিরলেন তারা

এখনো ঘুমের মধ্যে আঁতকে উঠেন আহতরা

by glmmostofa@gmail.com

নিজস্ব প্রতিবেদক।। 

ঢাকার উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজ ভবনে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায়  এখনো গোটা জাতি স্তম্ভিত।  প্রতিদিনের মতো সেদিনও কোমলমতি শিশুরা  বইখাতা গুছিয়েই স্কুলে গিয়েছিল।  মা চিরুণি দিয়ে চুলে সিঁথি করে দেন; ব্যাগে গুছিয়ে দেন টিফিন বক্স। আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে কপালে চুমু এঁকে দেন। প্রহর গুনতে থাকেন, ছুটি হলেই বুকের ধন ফিরবে। কিন্তু আর ফেরা হয়নি তাদের। বরং  দিন যতই যাচ্ছে ততই বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। সেই সঙ্গে  অগ্নিদগ্ধ হয়ে বহু শিক্ষার্থী আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। কারও ৫০ শতাংশ কিংবা তার বেশি বা কম পুড়ে গেছে।   স্কুলের বন্ধু, সহপাঠী স্বজদের হারিয়ে কোমলতি শিশুরা নির্বাক হয়ে গেছেন। গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে কচি মনকে। শিশু শিক্ষার্থী থেকে শুরু অভিভাবক-স্বজন যারা বিমান দূর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তাদেকে  দুর্বিষহ স্মৃতি তাড়া করছে। কচি কণ্ঠের হাসি স্তব্দ হয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে প্রাণচঞ্চলতা। এখনো শিশুরা  ঘুমের মধ্যে চিৎকার দিয়ে উঠেন।স্কুলে যাওয়ার কথা শুনলেই ভয় পাচ্ছেন। এখনও আকাশে বিমানের শব্দ কিংবা অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ পেলে কান্নাকাটি শুরু করে দেন। বেঁচে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করেও যেখানে থামানো যাচ্ছে না মৃত্যুর মিছিল, সেখানে মৃত‍্যুকে জয় করে ঘরে ফিরছেন দুই শিক্ষার্থী। হাসপাতাল ছাড়পত্র পাওয়া শিক্ষার্থীদের একজন ১২ বছর বয়সী আয়ান খান; আরেকজন একই বয়সী রাফসি আক্তার রাফিয়া।

শনিবার বিকাল ৩টার দিকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট থেকে তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়।

হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, গত সোমবার দুপুরে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বিমান বিধ্বস্ত ঘটনার দিন থেকেই বার্ণ ইউনিটে ভর্তি করা হয়। অন্যদের তুলনায় তাদের দুইজনেই তুলনামূলক কম দগ্ধ হয়েছিল। ফলে খুবই দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠায় তাদের দুজনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দগ্ধ হওয়া দুই শিশুর মধ্যে একজন হলেন মাইলস্টোন স্কুলের রাফসি আক্তার রাফিয়া। তার বাবার নাম মো. শামিম হোসেন এবং মায়ের নাম আখি আক্তার। দুই সন্তানের মধ্যে রাফিয়া ছোট। তার বড় একই স্কুলের  উত্তরার ১৫ নাম্বার সেক্টরে পরিবার নিয়ে তারা বসবাস করলেও তাদের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে।

সেই ভয়াবহ দিনে স্মৃতিচারণ করে  মো. শামিম হোসেন বলেন, বিমান দূর্ঘটনার সময়ে তার মা স্কুলেই ছিল। প্রতিদিনের মতই  মেয়েকে আনতে স্কুলে আনতে গিয়েছিল। তিনি হঠাৎ দেখেন বিমান স্কুল ভবনের উপরে পড়ে দাউ দাউ করে জ¦লে উঠছে। যেখানে বিমান পড়েছে সেখানেই মেয়ের ক্লাস ছিল। তার মা পাগল হয়ে ভেতর প্রবেশ করে। আমাকে ফোন দিয়ে জানালে আমিও দ্রুত স্কুলে আসি। অনেক খোঁজা খোজি শুরু করি। জালানা দিয়ে মেয়েকে ডাকি। কিন্তু কোন সাড়া শব্দ পাচ্ছিলাম। চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা জ¦লছে, ধোঁয়ায় চারদিকে ছিল। এর মধ্যে বাচ্চাদের পোড়া দেহ পড়ে আছে। ব্যাগ টিফিন,বাচ্চা ও অভিভাবকদের  চিৎকার, দৌড়াদোড়ি আর গণনবিদারি আহাজারিতে আকাশ বাতাস হয়ে ভারি উঠেছিল। এই দেখে মনে হচ্ছিল যেন কেয়ামমতের ময়দান। আমাদের মত সব অভিভাবকদের অবস্থাই করুণ। বাচ্চাদের না পেয়ে প্রতিটা মাবা স্বজনদের যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল,  এটা  না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না।

তিনি বলেন, অনেক খোঁজ করার রুমের মধ্যে মেয়ের ব্যাগ পাই। তখন কলিজাটা শুকিয়ে গেছিল। মনে হচ্ছে অন্যসব বাচ্চার মত আমার মেয়েটাও মনে আগুলে পুড়ে মারা গেছে। এক পর্যায়ে আমার বন্ধুর একটা ফোন পাই। সে আমার মেয়ের নাম বলতে পারছিল না। পরে ছবি পাঠায়। তখন আমার শরীর কাঁপছিল।  মেয়ের ছবি দেখে শরীরের কাঁপুনি থামে। সেই বন্ধু জানায়  উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে  মেয়ে ভর্তি আছে। হাতের কিছু অংশ আগুনে পুড়ে গেছে। এমনি আর কোন সমস্যা নেই।তখন দৌড়ে আমরা হাসপাতালে যাই। আমি শুনেছি এক ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা মেয়েকে উদ্ধার করে ওই  হাসপাতালে নিয়ে যায়।  সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বাসায় ফিরে আসি। চিকিৎসকরা দুই দিন বাসায় থাকতে বলেন। পরে দুই দিন পর আবার চিকিৎসকরা ব্যান্ডজ যখন খুলে তখন মেয়ের হাত দেখে অবাক হয়ে। পুড়ো হাত ঠুসকা পড়ে লাল হয়ে ভেতরের চামড়া  দেখা যাচ্ছে। ওখানে আর দেরি না করে বার্ণ ইউনিটে চলে আসি। সেখান তিন দিন চিকিৎসার মোটামোটি ভাল হওয়ার আজ রিলিজ দিয়েছেন।

শামিম হোসেন বলেন, চোখের সামনে কত বাচ্চাদের যন্ত্রণায় ছফছট করতে দেখেছি। হাসপাতালে অনেকেই মারা গেছেন। এখনও অনেকেই ভর্তি রয়েছেন। প্রত্যেকটা নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। আর যেসব বাচ্চারা মারা গেছেন তাদের মনে অবস্থা কত খারাপ হতে পারে। এই কয়দিন হাসপাতাল থেকে চোখের সামনে দেখেছি। আল্লাহ সহায় ছিল আমার মেয়ের বড় ধরনের কিছু হয়নি। এক প্রকার মৃত্যুর হাত থেকে আল্লাহ সরাসরি বাঁচিয়েছেন। কারণ যে অবস্থায় বিমান দূর্ঘটনা ঘটেছে কোন বাচ্চাই বাঁচার কথা নয়। অনেক বাচ্চার মত আমার বাচ্চাটাও মরে যেতে পারতো।

তিনি জানান, দগ্ধ হওয়ার পর থেকেই তার মেয়ে ঘুমাতে পারেন না। ঘুমাতে আতঁকে উঠেন এবং চিৎকার করে তার মাকে জড়িয়ে ধরেন। এত সহপাঠির  মৃত্যু, আগুনে  পোড়া শরীর দেখে যে কেউ ভয় পাবে এটাই স্বাভাবিক। আর ও-তো একটা বাচ্চা। তাই হয়তো বেশি ভয় পাচ্ছেন।

হাসপাতাল থেকে মৃত্যুকে জয় করে বাসায় ফেরা আরেক শিক্ষার্থী চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়ান খান (১২)।  সে মা-বাবা একমাত্র সন্তান। তাদের বাড়ি সাভারের আশুলিয়ায়। শিশুটির নাম বাবা মোস্তফা কামাল বাপ্পী। তিনি ব্যবসা করেন।  মায়ের নাম হামিদা আক্তার রিয়া। তাদের বাসা ঢাকার উত্তরার ১৮ নাম্বার সেক্টরে।

বিমান দূর্ঘটনার বিভৎস্য দৃশ্য বর্ণানা করে শিশুটির ফুফু শান্তা ইসলাম বলেন, আমিই আয়ানকে স্কুল থেকে আনতে গিয়েছিলাম। খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমরা কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই হঠাৎ করে বিমানটি স্কুলের ভবনের উপর আচঁড়ে পড়লো। প্রাণ বাঁচানোর জন্য বাচ্চা-অভিভাবকদের কান্নার রোল এখন মনে হলে শরীর হিম হয়ে আসে। আমিও আমার ভাতিজার চিন্তুায় এক প্রকার পাগল হয়ে গেছিলাম। কি ভয়াবহ আগুণ কাছে যাওযার কোন উপায় ছিল না। এক পর্যায়ে আগুনের তাপ কিছুটা কমলে যখন বাচ্চাগুলো আনা হচ্ছিল কারও শরীর পুরোটা পুড়ে গেছিল, মুখ  পেট,পীঠ হাত-পা থেকে চামড়া খসে পড়ছিল। মাথার চুল পুড়েছিল। অনেককে চেনার কোন উপায় ছিল না। এক পর্যায়ে আয়ানকে স্কুলের গেটের সামনে খুঁজে পাই। পরে সেখান থেকে বাংলাদেশ মেডিকেল চলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি কোন জায়গা নেই। রোগী আর রোগী। সেখানে থেকে  উত্তরা ক্রিসেন্টসহ তিন হাসপাতাল ঘুরেও কোন জায়গা পাচ্ছিলাম না। পরে বার্ণ ইউনিটে এসে ভর্তি করাই। সেখান থেকে শনিবার বিকালে রিলিজ দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, আগুণে আয়ানের শরীর তুলনামুলকভাবে কম পুড়েছে। তবে তার দুই কানে ও হাতে ফুসকা পড়ে গেছিলো। হাতগুলো সিদ্ধের মতো লাল লাল ছোপ  হয়ে  গেছিল। এখন সে দিনে কোন ধরনের ভয় না পেলেও রাতে চমকে উঠে।    দগ্ধ অনেক কম

তিনি বলেন, এ ঘটনা আমাদের সবাইকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।ফলে গোটা পরিবারের হৃদয়ে ভয়ংকর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আমাদের বাচ্চাটা তো বেঁচে আছে, কিন্তু যাদের বাচ্চা চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে। কচি কণ্ঠের হাসিগুলো নিভে গেছে। তাদের পরিবারের উপর দিয়ে বিশেষ করে মা-বাবার কি  অবস্থা হচ্ছে। সেটা ভাবলেই দম বন্ধ হয়ে আসে।

শিশুটির বাবা মোস্তফা কামাল বলেন, এ হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা, যা গোটা জাতিকে স্তম্ভিত করেছে। তবে ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমার বাচ্চাটার তেমন কোন ক্ষতি হয়নি।  সে সুস্থ আছে। যদিও কানে একটু সমস্যা আছে, আশা করছি সেটিও ঠিক হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, যে ভয়াবহ দূর্ঘটনা ঘটেছে। অনেক মা-বাবা তাদের বাচ্চাদের হারিয়েছে। এটা মেনে নেওয়ার মত নয়। তাই শুধু এই টুকু বলতে চাই -এভাবে যেন আর কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন এভাবে খালি না হয়।

বার্ন ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, বার্ন ইনস্টিটিউটে এখন চিকিৎসাধীন আছে ৩৬জন । এর মধ্যে  চারজন আইসিইউতে এবং ‘গুরুতর’ অবস্থায় আরও নয়জন।  আর সব হাসপাতাল মিলে চিকিৎসাধীনের সংখ্যা ৪৬ জন।

তিনি বলেন, যারা ক্রিটিক্যাল রোগী রয়েছে, প্রতি মুহূর্তেই তাদের ব্যাপারে যেকোনো সংবাদ পাওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত থাকি। তবে আমরা আশা করছি আগামী সপ্তাহের মধ্যে আরও ১০ জনকে রিলিজ দিতে পারব আমরা।

 

You may also like

সম্পাদক : হামীম কেফায়েত

গ্রেটার ঢাকা পাবলিকেশন নিউমার্কেট সিটি কমপ্লেক্স ৪৪/১, রহিম স্কয়ার

নিউমার্কেট, ঢাকা ১২০৫

যোগাযোগ : +8801712813999
ইমেইল : news@pran24.com