নিজস্ব প্রতিবেদক।।
অনিয়ম তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিয়োগ সংক্রান্ত এক স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মনোবিজ্ঞান বিভাগের মেডিকেল অফিসার নাফিয়া ফারাজানা চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্তের বিএসএমএম এর কর্তৃপক্ষ।
চলতি মাসের ১৭ নভেম্বর নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়মের স্ট্যাটাস দেয় এই মেডিকেল অফিসার। পরে গত রোববার সাময়িক বরখাস্তের অফিস আদেশ দেন বিএসএমএমইউ কতৃপক্ষ। অফিস আদেশ পাওয়ার পর কোন ধরনের অফিসিয়াল কাজ করতে পারছে না এই চিকিৎসক।
বিএসএমএমইউ কতৃপক্ষ বলছে, নাফিয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিছিন্নভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম সম্পর্কিত অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন, যা কর্তৃপক্ষের গোচরীভূত হয়েছে। এ ধরনের অপপ্রচারের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে এবং যা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষতা ও শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ এর ৫(৫) ধারা লঙ্ঘনের সামিল। সে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আইন, সংবিধি, অধ্যাদেশ ও প্রবিধান’ এর “দক্ষতা ও শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ” এর ২(জ) এবং ৫ (৩) ধারায় বর্ণিত অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ায় কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে এই মেডিকেল অফিসারকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করা হলো।
ডা নাফিয়া ফারজানা চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, পিজি হাসপাতালে প্রোমোশন সব সময় টাকা আদান প্রদানে হয়। ৪০-৫০ লাখ টাকা লেনদেন হয়। আমাদের ডিপার্টমেন্টে একজন আছে সিফাত ই সাইদ, ২০১৬ সালে অনিয়ম করে অ্যাসিসটেন্ট প্রফেসর হয়েছিলো। আমি তখন মামলা মামলা করি এবং হাইকোর্টে জিতেছিলাম। জেতার পরে ওনার প্রমোশন হয়না। ২০১৬-২০২৩ পর্যন্ত তার প্রমোশন আটকায় ছিলো। যেহেতু প্রমোশন আটকায় ছিলো সেজন্য ২০২৩ সালে উনি অ্যাসিসটেন্ট প্রফেসর হওয়ার জন্য আবার ইন্টারভিউ দিয়েছিন। সাধারণত অ্যাসিসটেন্ট প্রফেসর থেকে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হয়। সে যেহেতু প্রমোশন পাচ্ছিলোনা একই ডিপার্টমেন্টে সেইম পোস্টে ইন্টারভিউ দিয়েছে। ফলে এই বিষয়টা আমি ফেসবুকে লিখেছিলাম, এতো বছর মামলার, হাইকোর্টের রায়ের সমাধান হয়নাই, একই বিভাগে একই পদে নতুন করে যুক্ত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন,পিজি হাসপাতালে আমরা যারা ২০০৩ সালে জয়েন করেছে তাদের কোন প্রমোশন হয়না। আমি এ পর্যন্ত ৫ বার ইন্টারভিউ দিয়েছি। ইন্টারভিউ রুমে ঢোকার সাথে সাথে জিঙ্গেস করা হয়, আপনি কবে জয়েন করেছেন, সেসময় প্রধানমন্ত্রী কে ছিলো। আমরা সেসময় পাশ করেছি তাই সেসময় চাকরিতে ঢুকেছি। আমি বেসিক্যালি কোন রাজনৈতিক দলের না।
ডা নাফিয়া দাবি করেন, শুধু আমি না আমার ডিপার্টমেন্টে আরো দুজন আছে। ২০০৩-২০০৬ এর মধ্যে নিয়োগ পাওয়া অন্তত ২০০ ডাক্তারের কারো প্রমোশন হয়না। আমরা সবাই পোস্ট গ্রাজুয়েশন করা। ২০০৩ সাল থেকে আমি মেডিকেল অফিসার হিসেবে আছি। ২০১১ সালে আমি হাইয়েস্ট নাম্বার নিয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েশন পাশ করেছি আমি প্রাইম মিনিস্টার গোল্ড মেডেল পাওয়া। আমি স্ট্যাটাসে ওই মেয়ের নাম উল্লেখ করিনি।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে বিএসএমএমইউ-এর মেডিকেল অফিসারকে সাময়িক বরখাস্তের ঘটনায় নতুন করে ফ্যাসিজমের চরম বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম। বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, রাষ্ট্র থেকে কর্মক্ষেত্র দেশের প্রতিটা সেক্টরে ফ্যাসিজমের কালো থাবা অব্যাহত। সম্প্রতি ফেইসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে বিএসএমএমইউ-এর মেডিকেল অফিসারকে সাময়িক বরখাস্তের ঘটনায় নতুন করে ফ্যাসিজমের চরম বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখতে পাই। বিএসএমএমইউ-এর নিয়োগ নিয়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ করে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় মেধাবী চিকিৎসক গোল্ড মেডেলিস্ট ডা. নাফিয়া ফারজানা চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শুধুমাত্র তার নিয়োগকাল বিবেচনা করে ফ্যাসিস্ট সময়কালে নিয়োগ না পাওয়ায় নিয়মনিতির তোয়াক্কা না করে অন্য বিভাগে সহকারী অধ্যাপক নিয়োগ পাওয়া একজন কে মানসিক রোগ বিভাগে একই পদে নিয়োগ দেয়া হয়।
তিনি বলেন, এর আগেও ২০১৬ সালে নিয়োগের অনিয়মের অভিযোগ তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন এবং জয়লাভ করেন। এমন বিষয়গুলো এই প্রতিষ্ঠানে নতুন নয়। রাজনৈতিক বিবেচনা কিংবা শুধুমাত্র কোন আমলে নিয়োগ পেয়েছে তা বিবেচনা করে প্রচুর মেধাবী চিকিৎসককে বঞ্চিত করা এবং অযোগ্য লোকদের নিয়োগ দেয়া শুধু এই প্রতিষ্ঠানে নয় অন্যান্য কর্মক্ষেত্রেও নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তা বিভিন্ন সময়ে মিডিয়ার সামনে উঠে এসেছে। বিষয়গুলো নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেইসবুকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তার উপর নেমে আসে স্বৈরতান্ত্রিক ফ্যাসিজমের খড়গ।
তিনি বলেন, এর আগেও আমরা দেখেছি শুধুমাত্র ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেয়াকে কেন্দ্র করে বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরারকে হত্যার ঘটনা। এছাড়া করোনাকালীন সময়ের চিকিৎসক-নার্সদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে মানহীন মাস্ক ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনা নিয়ে ফেসবুকে প্রতিবাদ ঠেকাতে রীতিমতো আদেশ জারি করে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক স্ট্যাটাসের কারণে ডা নাফিয়া ফারাজানা চৌধুরিকে বহিস্কার করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে বিএসএমএমইউ এর রেজিস্টার প্রফেসর মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, এটি একটি অফিসিয়াল সিদ্ধান্ত। তাই এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করা উচিত হবে না।