মঙ্গলবার বেলা দুইটার সময় এমন এক দৃশ্য দেখা যায় রাজধানীর জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরী বিভাগের সামনে। আর হাসপাতালের ভেতরে আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) ভর্তি রয়েছেন জারিফ।
জানা গেছে, উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভবনে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আর অনেক শিক্ষার্থীর মতো গুরুতর আহত হন জারিফ। তার শরীরের ৩৮ শতাংশ দগ্ধ হয়। সে ওই স্কুলের ক্লাস সেভেন পড়েন। ছেলে আহত হওয়ার বিবরণ দিতে গিয়ে বার বার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তার মা-বাবা বোনসহ অন্য স্বজনরা। যেহেতু এখন তার আইসিইউতে চিকিৎসা চলছে তাই ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছেনা চিকিৎসকরা। ফলে হাসপাতালে বারান্দায় ছেলের জন্য উৎকন্ঠায় সময় কাটছে এই পরিবারের।
জারিফের বাবা বলেন, সোমবার বেলা ১ টা ৫৫ মিনিটে আমার কাছে প্রথম বিমান দূর্ঘটনার খবর আসে। তখন আমি ছিলাম একটি মেডিকেল। তখনই তার মাকে ফোন দিয়ে স্কুলে যেতে বলি। তারা গিয়ে প্রথমে উত্তরা এলাকায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু অবস্থা খারাপ হওয়ার সেখান থেকে দুপুরের দিকে বার্ণ ইউনিটে আসে। আমিও চলে আসি। এখন আইসিইউতে চিকিৎসা চলছে।
কান্নাজড়িত কন্ঠে তিনি বলেন, আমার নিষ্পাপ ছেলের চেহেরা এখন দেখলে কেউ চিনতে পারবে না। ওর দুই ও মুখ পুড়ে গেছে। ও সারাদিন পড়াশোনা করে।গতকাল থেকে আমার পুরো পরিবারের নাওয়া-খাওয়া বন্ধ। ওর মা বার বার জ্ঞান হারাচ্ছে। আমি এক অসহায় পিতা। কি শান্তনা দিবো। কারও মুখের দিকে তাকানো যায় না। ভেতরে ছেলেটা আগুনে পোড়া শরীর নিয়ে যন্ত্রণায় ছফফট করছে। আর বাইরে ছফফট করছি।
শুধু এই পরিবাবার নয় পুরো বার্ণ ইউনিট জুড়ে একই দৃশ্য দেখা গেছে। হাসপাতালে শয্যায় কারও সন্তান, কারও বোন, কারও ভাতিজা ভাগনা-ভাগনি কিংবা কারও আত্মীয় আগুনে পুড়া শরীর নিয়ে মরণ যন্ত্রণায় ছফফট করছে।আহতদের বেশির ভাগই শিশু। আর হাসপাতালের নিচ থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত প্রতিটি ওয়ার্ডের সামনে কিংবা হাসপাতালের বাইরে উদ্বিগ্ন হয়ে সেই অগ্নিদগ্ধদের মা-বাবা, ভাই বোনসহ স্বজনরা উৎবেগ-উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন। কারও চোখ ভেজা, কারও চোখ স্তব্ধ, শূন্য। তাদের কেউ কেউ ওয়ার্ডগুলোর সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। আবার কেউ কেউ মেঝেতে বারান্দায় করিডরে কিংবা সিঁড়ির মধ্যে অপেক্ষা করছেন। শুয়ে বসে সময় কাটাচ্ছেন। কারও মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। আবার কেউ কেউ দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিলেন, আর কাঁদছিলেন এবং স্বজনদেরকে রোগীদের সবশেষ অবস্থা জানাচ্ছেন। প্রত্যেক অভিভাবক ও স্বজনদের চোখে মুখে উদ্বিগ্নতা আর উৎকন্ঠা। এছাড়াও কেউ কেউ দরজার ফাঁক দিয়ে একবার চোখ মেলে প্রিয়জনকে দেখার আকুতি জানাচ্ছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসকরা জানান, আহতদের কারও ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ আবার কারও ২০ থেকে ৬০ শতাংশ পুড়ে গেছে। আবার অনেকের তার চেয়ে কম বা বেশি পুড়ে গেছে। তাদের মধ্যে অনেকের আবার শ্বাসনালি মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছে। ফলে অনেক রোগীর অবস্থা আশংকা জনক।
বার্ণ ইউনিটের রোগীদের চিকিৎসা বিষয়ে মঙ্গলবার বেলা তিনটার ইনস্টিটিউটের তিন তলায় সংবাদ সম্মেলন করেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। তিনি জানান, রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে আহত ৬৯ জন এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে বর্তমানে বার্ন ইনস্টিটিউটে এখন পর্যন্ত ৪৫ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে। তার মধ্যে ৩৬ জন শিক্ষার্থী। আর চারজন শিক্ষকসহ কয়েকজন স্টাফ রয়েছেন। আহতদের মধ্যে ২ জনের অবস্থা উন্নতি হওয়ায় বেডে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে ১০ জনের অবস্থা গুরুতর।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, বাইরে লোকজনের ভিড়ের কারণে রোগী হাসপাতালে নিতে দেরি হয়েছে। ভিড় কম হলে আরও আগে হাসপাতালে আনা যেত। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ২৯।
এসময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত অজ্ঞাতনামা ছয়টি লাশ আছে। এর মধ্যে চারজনের স্বজন এসেছেন। ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে লাশ হস্তান্তর করা হবে। এ ছাড়া বাকি দুজনের এখনো স্বজনদের খোঁজ মেলেনি।
সাইদুর রহমান বলেন, আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর থেকে একটি মেডিকেল টিম আজ রাতের মধ্যে ঢাকায় এসে পৌঁছাবে। এই টিমে একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও দুজন নার্স থাকবেন। বুধবার থেকে তাঁরা আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবায় যুক্ত হবেন।
হাসপাতালের পঞ্চম তলায় সিঁড়ি ধরে ফোনে কথা বলছিলেন আর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিলেন রাসেল আহমদ। বিমান দূর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে তার মেয়ে রাইসা আহমেদ ভেতর চিকিৎসাধীন।
ফোনে তিনি স্বজনদের বলছিলেন, আমার মেয়েটার মুখের দিকে তাকাতে পারছিনা। হাত-মুখ পুড়ে গেছে। যন্ত্রণায় খুব কষ্ট পাচ্ছে। তোমরা সবাই একটু দোয়া কর। আমার মেয়েটা যেন সুস্থ হয়ে উঠে।
রাসেল আহমদ বলেন, আমার তিন মেয়ের মধ্যে রাইসা সবার ছোট। সে মাইলস্টোনের স্কুলে চতূর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী। তার শরীরের ২০ শতাংশ পুড়ে গেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, অবস্থা খুব খারাপ। আমি কি করবো এখন বুঝে উঠতে পারছিনা। কাল থেকে মুখে পানি পর্যন্ত তুলতে পারছি না। আমার পুরো পরিবারের খাওয়া-দাওয়া সব বন্ধ হয়ে গেছে। মেয়ের এই অবস্থায় কি করে মুখে তুলি। এখন শুধু আল্লাহ আল্লাহ করছি। আর বলছি, হে আল্লাহ আমাকে একটু ধৈয্য ধারণ করার শক্তি দাও।
তিনি বলেন, সোমবার সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় আমাকে বললো, ‘আব্বু টা -টা, বাই বাই’, আমি স্কুলে যাচ্ছি। সেই হাসি খুশি মেয়েটা আমার যন্ত্রণায় কাতারাচ্ছি। বাবা হয়ে কিভাবে এই আমি এই যন্ত্রণা সহ্য করি বলেন।
হাসপাতালের তৃতীয় তলায় কক্ষের বাইরে ছেলেকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কান্না করছিলেন নুরে জান্নাত ঊষার মা ইয়াসমিন আক্তার। বিলাপ করে তিনি বলছেন, আমার মেয়ের সব পুড়ে গেছে, তোমরা কেউ তার জ্বলা বন্ধ করো। আমি আমার মেয়ের কষ্ট সহ্য করতে পারছি না। আমার বুকটা খালি হয়ে যাচ্ছে।
মা ইয়াসমিনের পাশে বসা ছেলে তাহমিন ইসলাম রোহান বলেন, ঊষার মাইলস্টোনে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। প্রতিদিনের মতো আজকেও বোনকে স্কুল থেকে আনতে যাই। গিয়ে দেখি স্কুলে বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। পরে ক্লাসরুমে গিয়ে খুঁজে দেখি বোনকে পাচ্ছি না। পরে ভেতর থেকে তাকে খুঁজে বের করে দেখি বোনের শরীর পুড়ে গেছে। পরে সঙ্গে সঙ্গে তাকে উত্তরার লুবনা হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখান থেকে পরে বার্ন ইউনিটে নিয়ে আসি। এখন তার চিকিৎসা চলছে।
হাসপাতালের নিচ তলায় ডুকরে ডুকরে কাঁদছিলেন লামিয়া তাসনীম। তার ভাই কাফি আহমেদের ১০ শতাংশ পুড়ে গেছে। সে মাইলস্টোনের স্কুলের ৫ম শ্রেণীর ছাত্র।
লামিয়া তার জন্য ভাইয়ের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়ে বলেন, ভাই এই মুর্হুতে মানসিক খুব খারাপ। কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে নেই।
বার্ণ ইনস্টিটিউটের বাইরে বের হতেই চোখে পড়ে স্বেচ্ছাসেবী আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ছিল চোখের পড়ার মত। কেউ পানি, স্যালাইন, শুকনো খাবার বিতরণ করছেন। হাসপাতালের প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে থাকা সেনাবাহিনীর সদস্যরা জনসাধারণের প্রবেশ রোধে কাজ করছেন। তাই ভেতরে প্রবেশ করতে পারছিলেন ইসলাম হোসেন। তার আট বছর বয়সী নাতী নাফিজ হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি জানান, আমার নাতি মাইলস্টোনের ৪র্থ শ্রেণীতে পড়ে। আগুনে তার শরীরের ৯০ শতাংশ পুড়ে গেছে। শুনেছি নাতিকে চেনা যাচ্ছে না। কথা বলতে পারছেনা। তাই নাতিকে এক নজর দেখার জন্য আসছি। এই বলেই ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠেন তিনি।
সোমবার তুলানায় মঙ্গলবার হাসপাতালে ভেতর ভিড় অনেক কম। তবে বাইরে অনেক আত্মীয়-স্বজনরা এবং স্বেচ্ছাসেকদের ভিড় দেখা গেছে। কেউ রক্ত দেওয়ার জন্য দৌড়াচ্ছিলেন, কেউ রক্ত দিতে অপেক্ষা করছিলেন। অনেকেই রক্ত সংগ্রহের জন্য প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। আর পরিস্থিতি সামলাতে সেনাবাহিনী র্যাব, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা সামাল দিতে হিমশিম খেতে দেখা গেছে। যদিও এদিন সকাল থেকে হাসপাতালে অতিরিক্ত ভিড় সামলাতে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। শুধুমাত্র রোগী, তাদের স্বজন এবং হাসপাতালের কর্মীদেরই ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে। সামরিক কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সাংবাদিকদেরও প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক কর্মী এবং উৎসুক দর্শকদের ভিড়ের কারণে চিকিৎসকেরা অসুবিধার সম্মুখীন হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান বলেন, দগ্ধদের বেশিরভাগই আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে। আবার অনেকের শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। আর যাদের শরীরের বড় অংশ পুড়ে গেছে, তাদের অবস্থা খুবই খারাপ। আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করছি সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।