মুরাদের স্বপ্ন কেড়ে নিলো ডেঙ্গু, ভাইয়ের শোকে বোনও মারা গেলেন

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ পরিবার

by glmmostofa@gmail.com

নাটোর প্রতিনিধি।।

অনেক স্বপ্ন নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি  হয়েছিলেন মুরাদ হাসান মৃধা। তার স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ পরিবারের হাল ধরবেন। বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু সব কিছু ওলপ-পালট হয়ে গেল। ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে সোমবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেকে) চিকিৎসাধীন থেকে তার মৃত্যু হয়। শুধু মুরাদ নয়, তার ওর মৃত্যুর খবর সহ্য করতে পারেনি চাচাতো বোন দোলেনা বেগম (৫০)। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মঙ্গলবার সকালে নাটোর সদর হাসপাতালে মারা যান তিনিও।একই পরিবারের দ্ইুজনের মৃত্যুতে স্বজন ও তার বন্ধুরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। আশপাশে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাদের হারিয়ে হারিয়ে বাক্রুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মুরাদ হাসানের মা মিনা বেগম বলেন, ‘আমরা মূর্খ মানুষ। ছেলে কী রোগে মারা গেল, কিছুই বুঝতে পারছিনি। কাকে বলব, কার কাছে পরামর্শ নিব, কিছুই ঠিক করতে পারিনি। শুধু ওকে লিয়া দৌড়াদৌড়ি করছি। কিন্তু কিছুতেই ভালো করতে পারিনি।’
মা মিনা বেগম বলেন, ‘আমরা মূর্খ মানুষ। ছেলে কী রোগে মারা গেল, কিছুই বুঝতে পারছিনি। কাকে বলব, কার কাছে পরামর্শ নিব, কিছুই ঠিক করতে পারিনি। শুধু ওকে লিয়া দৌড়াদৌড়ি করছি। কিন্তু কিছুতেই ভালো করতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘খেজুরগাছ লাগায়ে খুব কষ্টে ছেলি দুটাক মানুষ করছি। বড়টা গত বছর পড়া শেষ করি চাকরি পাইছে। ছোটটা (মুরাদ) মাসখানেক আগে ফাস্ট ক্লাস পেয়ে অনার্স পাস করিছে। বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু চাকরি পাওয়ার আগেই আমাদের ছাড়ি ছোটটা চলি গেল। ওর সুখ দেখতে পারনুনি।
বাড়ির ভেতরে একটা বেঞ্চে বসে ছিলেন বাবা আবদুস সাত্তার মৃধা। ডেঙ্গুতে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলেকে হারিয়ে তিনিও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
আবদুস সাত্তার মৃধা চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘আমার তো সব শেষ। আমি আর কী বলব?’

জানা গেছে, মঙ্গলবার সকালে মুরাদ মৃধার গ্রামের বাড়ি নাটোরের বড়াইগ্রামের খাটাসখৈল গ্রামে নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর বেলা ১১টায় জানাজা শেষে তাকে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এর ১০ দিন আগে মুরাদ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন বলে স্বজনরা জানিয়েছেন। পরবর্তীতে তিনি কিডনি জটিলতায় ও লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হন। মুরাদ মৃধা খাটাসখৈল গ্রামের আব্দুস সাত্তারের দুই ছেলের মধ্যে ছোট।
মুরাদের বাবা আব্দুস সাত্তার মৃধা জানান, অন্যের খেজুরের গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতেন। গুড় বিক্রির টাকা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চালান। বাড়ি ঘর তেমন একটা করতে পারেননি। উপার্জনের বড় অংশ ব্যয় করেছেন দুই ছেলের পড়াশোনায়। বড় ছেলে মুন্না মৃধা। তিনি গত বছর মাস্টার্স শেষ করে স্কয়ার কোম্পানিতে কর্মকর্তা পদে চাকরি করছেন। ছোট ছেলে মুরাদ আহমেদ মৃধা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী ছিলেন। এক মাস আগে তার অনার্স পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। স্বপ্ন ছিল পড়া লেখা শেষ করে বিসিএস ক্যাডার হবে।

তিনি আরও বলেন, মুরাদ ২৬ জানুয়ারি বাড়ি এসে জ্বরে আক্রান্ত হয়। সঙ্গে বমি ছিল। স্থানীয় একজন চিকিৎসককে দেখালে তিনি পরীক্ষা নিরীক্ষা করাতে দেন। রক্ত পরীক্ষায় ডেঙ্গু রোগ ধরা পড়ে। পাঁচদিন চিকিৎসা করার পরও সুস্থ না হওয়ায় তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে লিভার ও কিডনি সমস্যা ধরা পড়ে। গত বৃহস্পতিবার তার ডায়ালাইসিস শুরু হয়। কিন্তু তাতেও তিনি সুস্থ হননি। সোমবার তাকে দ্বিতীয় ডায়ালাইসিসে নেওয়া হলে অবস্থার আরও অবনতি হয় এবং সন্ধ্যায় তার মৃত্যু হয়। রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের নেতৃত্বে শতাধিক সহপাঠী তার মরদেহ বাড়িতে পৌঁছে দেন।

 

মুরাদের চাচা আফছার মৃধা বলেন, আমাদের পৈত্রিক জমি জমা তেমন ছিল না। তবুও ভাই তার ছেলেদের ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলেন। এমনকি সুদের ওপর টাকা ধার নিয়ে ছেলেদের লেখাপড়ার খরচ ও খাবারের ব্যবস্থা করতেন। তিনি বলেন, যে দিন অনার্সের ফল প্রকাশ হয় সেদিন মুরাদ বাড়িতে ছিল। আমাকে নিজ হাতে মিষ্টি খাওয়ায় মুরাদ। আমার কাছে দোয়া চেয়ে বলেছিল, সে বিসিএস কর্মকর্তা হবে।

মুরাদ আহমেদের কলেজ শিক্ষক রুহুল আমীন বলেন, মুরাদ আমার খুব প্রিয় ছাত্র ছিল। টানা তিন বছর ওকে পড়িয়েছি। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও ওর সঙ্গে আমার যোগাযোগ বন্ধ হয়নি। কয়েক দিন আগেও ফোন করে আমার খোঁজখবর নিয়েছেন। ওর মতো ভদ্র ও বিনয়ী ছাত্র পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।

মুরাদের স্কুলশিক্ষক অনিল ফ্রান্সিস রোজারিও। মুরাদকে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত তিনি পড়িয়েছেন। মুরাদের বাড়িতেই তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘ওকে নিজের ছেলের চেয়ে বেশি ভালোবাসতাম। আমার ছেলের রেজাল্ট হলে আমি নিজে দেখতাম না। কিন্তু ফল বের হলে আমি নিজে ওর ফলাফল দেখতাম। আমি স্বপ্ন দেখতাম, মুরাদ দেশের একজন বড় কর্মকর্তা হবে। কিন্তু সব স্বপ্ন কেড়ে নিলো ডেঙ্গু।

You may also like

সম্পাদক : হামীম কেফায়েত

গ্রেটার ঢাকা পাবলিকেশন নিউমার্কেট সিটি কমপ্লেক্স ৪৪/১, রহিম স্কয়ার

নিউমার্কেট, ঢাকা ১২০৫

যোগাযোগ : +8801712813999
ইমেইল : news@pran24.com