নিজস্ব প্রতিবেদক।।
দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির। একইসঙ্গে বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যু। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১৮১।এই মৃত্যুর ৫৯ শতাংশের বেশি ঢাকার দুই সিটিতে। আর সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ২০-৩০ বছর বয়সী রোগীদের মধ্যে। আর মোট মৃত্যুর ১১৪ জনের মধ্যে ৬৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মারা গেছেন, যার হার ৫৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ । এরপর ৭২ ঘন্টার পর ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার হার ২১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ১৮ জন মারা গেছেন ২৪- ৪৮ ঘন্টার মধ্যে, যার হার ১৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ । ৫ জন মারা গেছেন ৪৮-৭২ ঘন্টার মধ্যে যার হার ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ। মারা যাওয়া ৪০ শতাংশ রোগী অন্য রোগেও ভুগছিল। ডেঙ্গুতে বেশিরভাগ মৃত্যুর কারণ, ডেঙ্গু শক সিনড্রোম এবং হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হওয়া। এর মধ্যে শক সিনড্রোমে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ রোগীর। আবার আক্রান্তের শীর্ষে রয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মৃত রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে।
সোমবার ডেঙ্গুতে আর ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬৭৮ জন। এর আগের দিন রোববার একদিনে সর্বোচ্চ ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে, একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৭৪০ জন। এটিও একদিনে সর্বোচ্চ ভর্তির রেকর্ড।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, জ্বর,ঠান্ডা কাশি নয় পরিবর্তন এসেছে ডেঙ্গু উপসর্গেও। শরীর ব্যাথা,বমি,পাতলা পায়খানা সহ আরও নানা শারীরিক অস্বস্তির কারণ হতে পারে ডেঙ্গু। তাই সবাইকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি জ্বরের দ্বিতীয় দিন ডেঙ্গু পরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছেন।
তারা বলেন, তীব্র তাপপ্রবাহের পর থেমে থেমে বৃষ্টি আবহাওয়ায় বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। যা ডেঙ্গু বৃদ্ধির আদর্শ অবস্থা। তাই সামনের দিনগুলোতে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে আক্টোবরে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে।সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর তৎপরতার অভাব এবং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত ঘাটতি রয়েছে। মশক নিধনে জনসম্পৃক্ততার পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম বাড়ানোর বিকল্প নেই বলে মনে করেন তারা।
সোমবার বিকেলে ডেঙ্গু বিষয়ক এক সংবাদ সম্মেলনে করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। সেখানে অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর বলেন, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কারণ শক সিনড্রোম, দ্বিতীয় হলো, রোগীরা হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি করছে, এর সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদী রোগ মৃত্যুর ঝুকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ডেঙ্গুতে যারা মারা গেছেন, তাদের অনেকেই খারাপ অবস্থায় হাসপাতালে এসেছেন। অনেক সময় দেরিতে ভর্তি হচ্ছেন, ফলে চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ খুব সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
গত বছরের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে মহাপরিচালক বলেন, ২০২৪ সালের জুনে মারা যান ৮ জন, জুলাইয়ে ১৪ জন, আগস্টে ৩০ জন এবং সেপ্টেম্বরে ৮৭ জন। সে বছর জুনে রোগী ভর্তি হয়েছিল ৭৯৮ জন, জুলাইয়ে ২ হাজার ৬৬৯, আগস্টে ৬ হাজার ৫২১ এবং সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৮৯৭ জন। তিনি বলেন, পরিসংখ্যান স্পষ্ট করছে, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং মৃত্যুও ঘটে সবচেয়ে বেশি।
তিনি আরও বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য শুধু ব্যবস্থাপনা জানানো নয়, জনগণকে সম্পৃক্ত করাও। কারণ, যত উদ্যোগই নেওয়া হোক, মানুষ সচেতন না হলে ডেঙ্গুর মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যায়।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে ডা. জাফর বলেন, ডেঙ্গু যদি শুরুতেই শনাক্ত করা না যায় এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু না হয়, তাহলে মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। আপনাদের সহযোগিতা আমাদের দরকার, যাতে সচেতনতা আরও ছড়িয়ে দেওয়া যায়।
সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতাল পরিচালনা শাখার পরিচালক ডা. মইনুল হাসান জানান, ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য একটি বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন করা হচ্ছে, যাতে প্রতিটি রোগী একজন নির্দিষ্ট চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকেন। একইসঙ্গে হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ডেঙ্গু শনাক্তের জন্য এনএস১ কিট সব জায়গায় মজুত আছে এবং পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদফতরে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি) শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো, হালিমুর রশীদ জানান, ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে। ২০-৩০ বছর বয়সে রোগী বেশি মারা যাচ্ছে। রোগীরা ৩-৬ দিন ধরে জ্বরে ভুগার পর হাসপাতালে আসছেন, মারা যাওয়া ৯০ জন রোগী মধ্যে ৩৯ জনেই দীর্ঘ মেয়াদী রোগে ভুগছিলেন।
তিনি জানান, ১১৩ রোগীর তথ্যে জানা যায় ৫৬ জন ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে মারা গেছেন। যার হার ৫০ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম। এতে মারা যায় ৩৬ জন (প্রায় ৩২ শতাংশ)। উভয় সমস্যা ছিল ৯ জনের, এছাড়া ডেঙ্গুর সঙ্গে কার্ডিয়াক শকে মারা যায় ৯ জন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৬ থেকে ৩০ বছর বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্ত ও মৃত্যু বেশি। এই বয়সে আক্রান্ত হয়েছে ১৬ হাজার ২২১ জন। যা মোট চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্তের মোট ৩৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। তবে মোট ১৭৯ জনের মৃত্যুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৩ জনের বয়স ছিল ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। এছাড়া ১০ বছরের কম বয়সী ১৬ জন, ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে ১০ জন, ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ১৫ জন, ৪০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ১৬ জন, ৫০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ১৫ জন, ৬০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে ১৩ জন, ৭০ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে এক জন এবং ৮০ থেকে ৯০ বছরের মধ্যে দুই জনের মৃত্যু হয়েছে এ বছর।
মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষন করে দেখা গেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গুতে মৃত্যু ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। যা মোট মৃত্যুর ৫৯ দশমিক ১২ শতাংশ। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৮৫ জনের (প্রায় ৪৭ শতাংশ), ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২২ জনের (১২ দশমিক ১৬ শতাংশ)। আর ঢাকা বিভাগে ২ জনের (দুই সিটির বাইরে ১ দশমিক ১১ শতাংশ)। সব মিলিয়ে ঢাকা বিভাগ ও দুই সিটিতে মৃত্যু হার ৬০ দশমিক ২২ শতাংশ। এরপর বরিশাল বিভাগে ২৮ জন বা ১৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ, চট্টগ্রামে বিভাগে ২৩ জন বা ১২ দশমিক ৭০ শতাংশ। এছাড়া রাজশাহী বিভাগে ১০ জন বা ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ, ময়মনসিংহ ৬ জন ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ, খুলনা বিভাগে ৫ জন বা ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং রংপুর, সিলেট কোন মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি।
একইভাবে আক্রান্তেও শীর্ষে রয়েছে ঢাকার দুই সিটি। এ বছর ডেঙ্গুতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৪২ হাজার ৫০৯ জন। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটিতে ৬ হাজার ৫৩০ জন (১৫ দশমিক ৩০ শতাংশ), উত্তর সিটিতে ৪ হাজার ৫৯৬জন (১০ দশমিক ৮১ শতাংশ) এবং দুই সিটির বাইরে ঢাকা বিভাগে ৬ হাজার ২২০( ১৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ)। ঢাকা বিভাগ ও দুই সিটি মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ১৭ হাজার ৩৪৬ জন। যার শতাকরা হার ৪০ দশমিক ৮০ শতাংশ। আক্রান্তের হারে এর পরে রয়েছে বরিশাল বিভাগ। এ বিভাগের মোট আক্রান্ত হয়েছেন ১২ হাজার ৩১৯ জন, যার হার প্রায় ২৯ শতাংশ এবং চট্রগ্রাম বিভাগে ৬৫০২ জন, যার হার ১৫ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্য বিভাগের তুলনামুলক আক্রান্তের হার অনেক কম।
স্বাস্থ্য অধিদফদর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রাখে ২০০০ সাল থেকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি ১৭০৫ জনের মৃত্যুও হয় ওই বছর।
ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে এবার বেশি মৃত্যু হচ্ছে এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর বলেন, কেউ যখতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন তখন তার প্লাজমা লিকেজ হয়। সার্কুলেশন থেকে তরল পদার্থ (প্লাজমা) বের হয়ে পেটে জমা হয়, ফুসফুসের চারপাশে জমা হয়। তখন রোগীর রক্তচাপ কমে যায়, শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হয়। এটাকে বলে ডেঙ্গু শকড সিনড্রোম। আবার ডেঙ্গু রোগীর শরীরে তরল পদার্থ কমে গিয়ে, ব্লাড প্রেসার কমে যায়, প্রস্রাব কমে যায়, পেটে পানি জমে, ফুসফুসে পানি জমে, রোগীর বোধশক্তি কমে যায় এবং বমি হতে থাকে।তাই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পরপরই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হলে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
তিনি বলেন, আমরা যত ব্যবস্থা নেই, জনগন সচেতন না হলে ডেঙ্গু থেকে মুক্তি পাওয়া দুষ্কর।
ডেঙ্গু মোকাবেলায় সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে সিডিসি শাখার লাইন ডিরেক্টর ডা. হালিমুর রশিদ বলেন, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করার জন্য সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় পর্যাপ্ত প্লইড সরবরাহ করা হয়েছে। কোথাও কোনো ঘাটতির খবর শোনা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, এখন চিকিৎসকের কাছে গেলেই রোগীকে এনএসওয়ান পরীক্ষা দেওয়া হয় । পরীক্ষায় পজিটিভ এলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। এ কারণে আমাদের পরামর্শ জ্বর হলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। কিন্তু বয়স কম হওয়ার কারণে কম বয়সী মানুষ জ্বরকে গুরুত্ব দেয় না। ফলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দু-তিন দিনের মধ্যে অনেকে মারা যাচ্ছেন।
অক্টোবরে মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে এমন শষ্কা প্রকাশ করে কীটতত্ত্ববিদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, আমাদের দেশে একসময় ধারণা করা হতো, বর্ষাকাল মানেই ডেঙ্গুর মৌসুম। কিন্তু এখন সেই ধারণা বদলে যাওয়ার সময় এসেছে। কারণ এখন শুধু বর্ষা নয়, শীত-গ্রীষ্মেও এই রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটছে। আমাদের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, লোকবলের ঘাটতি ও জনসচেতনতার অভাবে উল্টো শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়েছে।
তিনি বলেন, মশক নিধনের কার্যক্রম শুধু মৌসুমকেন্দ্রিক চালালে ফল পাওয়া যাবে না। সারা বছরই করতে হবে কাজটি। তা না হলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না।