কম বয়সীদের এত স্ট্রোক কেন?

প্রথম তিন ঘণ্টা কতটা জরুরি

by glmmostofa@gmail.com

নিউজ ডেস্ক :
বিশ্বে বর্তমানে মৃত্যুর দিক থেকে হৃদরোগের পরেই রয়েছে স্ট্রোকের অবস্থান। রোগটির মুল কারণ মানুষের অনিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপন। আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হতেন মূলত প্রবীণ বা বয়স্করাই। কিন্তু এখন তা আর নেই। এখন তরুণ প্রজন্মদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে এই প্রবণতা। যে কারণে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বেই তরুণদের মধ্যে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপও ৫০ ভাগ স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত ডায়বেটিস, ধুমপান, নিয়মিত মদ্যপান, কায়িক পরিশ্রম না করা, ফাস্টফুড বা জাঙ্ক ফুড গ্রহণও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
গবেষণা বলছে, ৪৫ এবং তার চেয়েও কম বয়সীদের মধ্যে স্ট্রোকের আশঙ্কা ১০-১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকী ৩০ বছরের কম বয়সেও স্ট্রোক হচ্ছে অন্তত ৭-৯ শতাংশ ক্ষেত্রে। কী কারণে তরুণদের মধ্যে বাড়ছে এই রোগ?
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, দেশে প্রতি হাজারে ১২ জন মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত এবং অসংক্রামক এ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বে প্রতি মিনিটে দশ জন প্রাণ হারাচ্ছেন।
ঢাকা মেডিকেলের নিউরোসার্জারি বিভাগের সহাকারী অধ্যাপক ডা. মো. মোতাশিমুল হাসান শিপলু বলেন, স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগী চেনার উপায়Ñমুখ বেকে যাওয়া, হাত একদিকে ঝুঁলে যাবে বা শক্তি কম পাবে, চোখে ঝাপসা দেখা এবং রোগীর কথা জড়িয়ে যাবে। তীব্র মাথা ব্যথা এবং রোগী হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে পারে।
জানা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে স্ট্রেসে বা মানসিক চাপে ভুগলে ভাস্কুলার প্রদাহ, হার্ট অ্যাটাক কিংবা স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি হয়। স্ট্রেস শরীরে যেকোনও কাজে বাধা সৃষ্টি করে। ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে খারাপ হওয়া সত্ত্বেও অনেকেই এই নেশা ত্যাগ করতে পারেন না। এই নেশাই অনেককে ঠেলে দেয় মৃত্যুর মুখে। কমবয়সী অনেকেই ধূমপানে আসক্ত তাই তাদের স্ট্রোকের প্রবণতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। দূষণে ভরা আবহাওয়া স্ট্রোকের অন্যতম কারণ।
চিকিৎসকদের মতে, ডায়াবেটিস আক্রান্তদের স্ট্রোকের ঝুঁকি থাকে। কর্মক্ষেত্রের চাপ, আধুনিক ব্যস্ত জীবনের জটিলতা হাইপারটেনশনের সমস্যা ডেকে আনছে। ফলে ডায়াবেটিসের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তাই সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে স্ট্রোকের ঝুঁকি।

স্ট্রোক কিভাবে বুঝবেন?
স্ট্রোকের সাথে অনেকে হার্ট অ্যাটাককে গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা।

স্ট্রোক মূলত মানুষের মস্তিষ্কে আঘাত হানে। ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মস্তিষ্কের কোন অংশে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে মস্তিষ্কের কোষগুলো মরে গেলে স্ট্রোক হয়।
সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য শরীরের প্রতিটি কোষে রক্ত সঞ্চালন প্রয়োজন। কারণ এই রক্তের মাধ্যমেই শরীরের কোষে কোষে অক্সিজেন পৌঁছায়।
কোন কারণে মস্তিষ্কের কোষে যদি রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয়, রক্তনালী বন্ধ হয়ে যায় বা ছিঁড়ে যায় তখনই স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকির সৃষ্টি হয়।সাধারণত ৬০-বছরের বেশি বয়সী রোগীদের স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি থাকলেও তবে ইদানীং তরুণ এমনকি শিশুরাও স্ট্রোকে আক্রান্ত আক্রান্ত হচ্ছেন।
স্ট্রোক তিন ধরনের হয়ে থাকে। মাইল্ড স্ট্রোক, ইসকেমিক স্ট্রোক ও হেমোরেজিক স্ট্রোক।
মাইল্ড স্ট্রোকে রোগীর মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ সাময়িক বন্ধ হয়ে আবারও চালু হয়। এটি মূলত বড় ধরণের স্ট্রোকের পূর্ব লক্ষণ।ইসকেমিক স্ট্রোকে মস্তিষ্কের ও শরীরের অন্যান্য স্থানের রক্তনালীতে রক্ত জমাট বাঁধে। হেমোরেজিক স্ট্রোকে মস্তিষ্কের রক্তনালী ছিঁড়ে রক্তপাত হয়।
স্ট্রোকের সাধারণ কিছু লক্ষণ হল:
১.আচমকা হাত, পা বা শরীরের কোনও একটা দিক অবশ হয়ে যাওয়া। হাত ওপরে তুলতে না পারা।
২. চোখে ঝাপসা/ অন্ধকার দেখা।
৩. কথা বলতে অসুবিধা হওয়া বা কথা জড়িয়ে যাওয়া।
৪. ঢোক গিলতে কষ্ট হওয়া।
৫. জিহ্বা অসাড় হয়ে, মুখ বেঁকে যাওয়া।
৬.শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে পড়ে যাওয়া/জ্ঞান হারানো।
৭. হঠাৎ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাজ পড়ার মতো তীব্র মাথাব্যথা।
৮.বমি বমি ভাব, বমি, খিঁচুনি হওয়া।

প্রথম তিন ঘণ্টা খুব জরুরি:
স্ট্রোক লক্ষণ দেখা দেয়ার পর থেকে তিন থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা সময় খুবই ক্রিটিকাল।
এই সময়ের মধ্যে বা তার আগে রোগীকে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হলে মৃত্যু-ঝুঁকি অনেকটাই ঠেকানো সম্ভব। তবে এই সময়কাল একেকজন রোগীর স্বাস্থ্য পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। অনেকের তিন ঘণ্টায় যে ক্ষতি হয়, সেটা হয়তো আরেকজনের ক্ষেত্রে আরও পরে গিয়ে হতে পারে। সাধারণত স্ট্রোকের রোগী সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে আসলে চিকিৎসকরা আই ভি থ্রম্বোলাইসিস চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। চিকিৎসকরা ইনজেকশনের মাধ্যমে এমন একটা ওষুধ দেন যা রক্তনালীর ব্লক ছুটিয়ে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক করে। ওষুধ দেয়ার এই পদ্ধতিকে বলা হয় থ্রোম্বোলাইসিস।রোগীকে যদি লক্ষণ দেখা দেয়ার ৮ থেকে ১৬ ঘণ্টার মধ্যে আনা হয় তাহলে চিকিৎসকরা সাধারণত মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমি চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।এই প্রক্রিয়ায় একটি বিশেষ যন্ত্র বা ক্যাথেটার দিয়ে রোগীর রক্তনালীতে জমাট বাঁধা রক্ত অপসারণ করে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করা হয়। এ ধরণের চিকিৎসা শেষে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন।

নিয়মিত স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠলে স্ট্রোকের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন:
১. উচ্চ রক্তচাপ, ডায়বেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা।
২.অতিরিক্ত তেলচর্বি ও চিনি-লবনযুক্ত খাবার, ভাজাপোড়া, ফাস্টফুড এড়িয়ে পুষ্টিকর ডায়েট মেনে চলা।
৩. ধূমপান, জর্দা-তামাক, মাদক সেবন, মদপান এড়িয়ে চলা।
৪. প্রতিদিন ৬-৮ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম।
৫. শরীরচর্চা বা নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম করা। ওজন ঠিক রাখা।
৬.প্রতি ছয়মাস অন্তর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা।

You may also like

সম্পাদক : হামীম কেফায়েত

গ্রেটার ঢাকা পাবলিকেশন নিউমার্কেট সিটি কমপ্লেক্স ৪৪/১, রহিম স্কয়ার

নিউমার্কেট, ঢাকা ১২০৫

যোগাযোগ : +8801712813999
ইমেইল : news@pran24.com