শিশু বিকাশ কেন্দ্র: ৩৫ চিকিৎসক ও ২৩ মনোবিজ্ঞানীর পদ বাতিল

by glmmostofa@gmail.com

নিজস্ব প্রতিবেদক।। 

দেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের শিশু বিকাশ কেন্দ্রের চিকিৎসকের ৩৫ ও মনোবিজ্ঞানীর ২৩টি পদ বাতিল করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে বাতিল করা হয়েছে সব অফিস ব্যবস্থাপক ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীর পদও। অপরিহার্য এসব চিকিৎসক স্বাস্থ্যকর্মী বাদ দিয়ে মাত্র ১২ জন মনোবিজ্ঞানী এবং ৩৫টি থেরাপিস্টের পদ রাখা হয়েছে। তবে তাদেরকেও করে দেওয়া হয়েছে আউটসোর্সিংয়ের আওতাভুক্ত।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, শিশু বিকাশ কেন্দ্রের চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসাসেবার লক্ষ্যে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ‘শিশু বিকাশ কেন্দ্র’ প্রকল্প চালু হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) আওতায় ‘হাসপাতাল সেবাব্যবস্থাপনা (এইচএসএম)’ শীর্ষক কার্যক্রম পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশের ২৪টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ১১টি জেলা সদর হাসপাতালে শিশু বিকাশ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।

এই কেন্দ্রগুলোতে ০ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে যারা অটিজম, ডাউন সিনড্রোম, নিউরো-উন্নয়নজনিত সমস্যা (নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার), সেরিব্রাল পালসি, এডিএইচডি (মনোযোগ ঘাটতি ও অতিসক্রিয়তা), খিঁচুনি ও মৃগীরোগ, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে জটিলতা, শেখার অক্ষমতা, দেরিতে কথা বলা কিংবা অন্যান্য বাক সমস্যায় ভুগছে—তাদের নিয়মিত সেবা ও থেরাপি দেওয়া হয়।

সূত্র মতে, শিশু বিকাশ কেন্দ্রে যে মডেলটি অনুসরণ করা হয়, তা হলো পাঁচ সদস্যের একটি দল—একজন অভিজ্ঞ শিশু স্বাস্থ্য চিকিৎসক, একজন শিশু মনোবিজ্ঞানী, একজন ডেভেলপমেন্টাল থেরাপিস্ট, একজন অফিস ব্যবস্থাপক এবং একজন পরিচ্ছন্নতা কর্মী নিয়ে গঠিত। তাঁরা প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত
স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকেন।

গত বছরের জুন মাসে শিশু বিকাশ কেন্দ্রসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন সবগুলো অপারেশনাল প্ল্যানের মেয়াদ শেষ হয়। পরবর্তীতে এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ চললেও বেতন-ভাতার পাশাপাশি চাকরি অনিশ্চয়তায় পড়েন শিশু বিকাশ কেন্দ্রের কর্মকর্তারা। প্রায় এক বছরেও কোনো সমাধান দেওয়া হয়নি। বিষয়টিকে অমানবিক আখ্যা দিয়ে তারা সরকারের কাছে তিনটি দাবি জানিয়েছে।

দাবিগুলো হলো—

১. ১৫ মাসের বকেয়া বেতন
২.  সমস্ত জনবল ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্তিকরণ
৩. সর্বশেষ রাজস্বখাতে আত্মীকরণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহম্মেদ চৌধুরী  বলেন, সরকারকে এটা বুঝতে হবে, হঠাৎ করে শিশু মনোবিজ্ঞানী বারোটি পদ রেখে ২৩টি কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার অর্থ হলো—সেবাটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া। ২০০৮ সাল থেকে শুরু হওয়া শিশু বিকাশ কেন্দ্র থেকে এ পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ মানুষ সেবা নিয়েছে।

যে শিশু বিকাশ কেন্দ্রে শিশু মনোবিজ্ঞানীর পদ বিলুপ্ত করা হচ্ছে, সেই অঞ্চলের শিশু ও কিশোরদের কি কোনো সমস্যা হবে না—সরকার কি তার নিশ্চয়তা দিচ্ছে? যেখানে শিশু মনোবিজ্ঞানী রয়েছেন, সেই কেন্দ্রগুলোতেই তো শিশুদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত হচ্ছে এবং সেখান থেকেই তারা সেবা পাচ্ছে।

‘আমি মনে করি, এটি সরকারের একটি ভুল সিদ্ধান্ত। জানি না ঠিক কোন যুক্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।বাজেট সংকোচনের কারণে হতে পারে। কিন্তু সেই যুক্তিকে মেনে নেওয়া কঠিন। কারণ সরকার জনগণের জন্য, মুনাফার জন্য নয়। দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি সেবা বন্ধ করে দেওয়া জনগণের বিপক্ষে যাওয়া’—যোগ করেন তিনি।

একটি বিশেষায়িত টিমওয়ার্ক নির্ভর সেবা:

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে অবসরপ্রাপ্ত নবজাতক ও শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ইফ্ফাত আরা শামসেদ বলেন, শিশু বিকাশের সেবা একটি বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা, যার বৈশিষ্ট্য হলো মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি অ্যাপ্রোচ বা বহুবিধ পেশাজীবীর সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থা। এই সেবায় একজন চিকিৎসক, একজন সাইকোলজিস্ট এবং একজন থেরাপিস্ট—এই তিনজনের সমন্বিত টিম গঠন করা হয়। কারণ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের বিভিন্ন রকম শারীরিক, মানসিক ও বিকাশজনিত সমস্যা থাকে, যেগুলো এককভাবে নয়, বরং সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।

এই তিনটি পদের মধ্যে চিকিৎসক হলেন ইনচার্জ। তবে এই চিকিৎসক শুধু সাধারণ কোনো চিকিৎসক নন—তারা শিশু বিকাশ বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কোনো চিকিৎসককে শিশু বিকাশ কেন্দ্রে নিয়োগ দেওয়ার আগে অবশ্যই তাকে প্রাসঙ্গিক প্রশিক্ষণ দিতে হয়। প্রশিক্ষণ ছাড়া একজন সাধারণ চিকিৎসকের পক্ষে এই কেন্দ্রগুলোতে কাজ করা সম্ভব নয়।

তিনটি পদের যেকোনো একটি বাদ দিলে শিশু বিকাশ কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা বিঘ্নিত হবে। কেননা, এটি একটি সমন্বিত পদ্ধতি—যেখানে চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করেন, থেরাপিস্ট থেরাপি দেন, আর সাইকোলজিস্ট মানসিক সহায়তা প্রদান করেন।

এখানে সাইকোলজিস্ট ও থেরাপিস্টদের ইনচার্জ হলেন চিকিৎসক। ফলে চিকিৎসক ছাড়া এই টিমের কার্যকারিতা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ইনচার্জকেই বাদ দিলে গোটা কাঠামোই ভেঙে পড়বে।

বাংলাদেশের বাইরেও স্বীকৃত এই শিশু বিকাশ পদ্ধতি:

শিশু বিকাশ কেন্দ্রের এই চিকিৎসা-পদ্ধতি একটি নির্দিষ্ট মেমোরেন্ডাম (স্মারকলিপি) অনুসারে পরিচালিত হয়। এটি একটি প্রকল্পের আওতায় গঠিত হয়েছে, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা আছে—কেন তিনটি পদেরই প্রয়োজন রয়েছে এবং কেন একটি মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি টিম ছাড়া শিশু বিকাশ কার্যকরভাবে সম্ভব নয়।

এই ধারণাটি শুধু বাংলাদেশে নয়, অন্যান্য দেশ, যেমন ভুটান ও তাইওয়ান কর্তৃকও গ্রহণ করা হয়েছে। এই পদ্ধতির মেমোরেন্ডাম লিখেছেন বিশিষ্ট শিশু স্নায়ুবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. নায়লা জামান খান। তিনি একসময় জাতীয় সমন্বয়কারী (ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটর) হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি সংস্কার কমিশনের সদস্য। শিশু বিকাশ কেন্দ্র নিয়ে স্বাস্থ্যখাত সংস্কার প্রস্তাবনাতেও তিনি নতুন করে লিখেছেন। সেখানে চিকিৎসককে বাদ দেওয়ার মতো কোনো প্রস্তাবনা নেই।

অতএব, শিশু বিকাশ কেন্দ্র থেকে চিকিৎসক বা যেকোনো একটি পদ বাদ দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পুনর্বিবেচনা করা উচিত সরকারের।

যে কারণে সকল পদ অত্যাবশ্যকীয়:

শিশু বিকাশ কেন্দ্রের কর্মকর্তারা বলেন, এই কেন্দ্রে যেসব শিশু আসেন, তারা দীর্ঘমেয়াদে সেবা নেন। তাদের জন্য প্রয়োজন হয় নিয়মিত থেরাপি, কাউন্সেলিং এবং সার্বিক বিকাশের মূল্যায়ন। যেহেতু এই শিশুরা নিউরো-উন্নয়নজনিত (নিউরোডেভেলপমেন্টাল) সমস্যায় ভোগে, তাদের নিয়মিত ফলোআপের জন্য বিভিন্ন ক্লিনিকে আসতে হয়। এই সব শিশুর তথ্য, নথিপত্র, ফলোআপের তারিখ ও সময় পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন অফিস ব্যবস্থাপক।

একজন চিকিৎসক শিশুর শারীরিক সমস্যা, ওষুধের প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি মূল্যায়ন করে সেবা দেন। একজন শিশু মনোবিজ্ঞানী (সাইকোলজিস্ট) শিশুর মানসিক বিকাশ, সামাজিক ও আচরণগত মানিয়ে নেওয়ার বিষয়গুলো পরিচালনা করেন। তিনি পিতামাতার পরামর্শ ও কাউন্সেলিং-ও করে থাকেন। যদি কোনো শিশুর বিশেষ বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া প্রয়োজন হয়, অথবা বাড়িতে অতিরিক্ত মানসিক সহায়তার প্রয়োজন দেখা দেয়, সেক্ষেত্রেও মনোবিজ্ঞানী প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও মূল্যায়ন করেন।

বিকাশ থেরাপিস্ট শিশুর স্পিচ থেরাপি (বাক্ থেরাপি), অকুপেশনাল থেরাপি (পেশাগত থেরাপি), বা দৃষ্টিজনিত সমস্যার ক্ষেত্রে লো ভিশন ক্লিনিক পরিচালনা করেন। এসব ক্লিনিকেও তিনি থেরাপি প্রদান করেন।

কর্মকর্তারা আরও বলেন, ‘আমরা এখানে একটি বহু-পেশাজীবী দলগত পদ্ধতিতে কাজ করি, কারণ বিকাশজনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের ব্যাপারে একাধিক পেশাজীবীর যৌথভাবে কাজ করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়ায় এবং পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, প্রতিটি শিশুর সেবা দেওয়ার পরপরই আমাদের একজন পরিচ্ছন্নতা কর্মী পুরো সেটআপটি পরিষ্কার করেন, যেন পরবর্তী শিশুর সেবা নিরাপদভাবে দেওয়া যায়।’

পদ বাতিল করার প্রশ্নে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর (এইচএসএম) ডা. মো. জয়নাল আবেদীন টিটো বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয়ে আমাদের প্রস্তাব ছিল—সবগুলো পদ বহাল থাকুক, কারণ এগুলো অত্যাবশ্যক সেবা। এগুলোকে যুক্ত রাখা উচিত বলে আমরা মনে করি।

You may also like

সম্পাদক : হামীম কেফায়েত

গ্রেটার ঢাকা পাবলিকেশন নিউমার্কেট সিটি কমপ্লেক্স ৪৪/১, রহিম স্কয়ার

নিউমার্কেট, ঢাকা ১২০৫

যোগাযোগ : +8801712813999
ইমেইল : news@pran24.com