নিজস্ব প্রতিবেদক।।
রোজ প্রতিদিনের মতোই সেদিন সকালেও স্কুলে যাওয়ার জন্য ইউনিফর্ম পরেছিল তাসনিম আফরোজা আয়মান। মা সুন্দর করে মাথায় সিঁথি করে চুলে চিরুনি করে দিয়েছিলেন; সাজিয়ে দিয়েছিলেন টিফিন বক্সও। আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে স্কুলে গিয়েছিল ছোট্ট শিশুটি। স্কুলে যাওয়ার সময় মাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল ‘লাভ ইউ মা’। পরে বাবার হাত ধরে হাসতে হাসতে স্কুলে চলে যায়। তার মা- কি ভেবেছিল এটাই আমার কলিজার টুকরা শেষ স্কুল যাওয়া। হযতো ভেবেছিল স্কুল থেকে ফিরে আবার আমাকে জড়িয়ে ধরে বলবে ‘লাভ ইউ মা’। কপালে চুমু খাবে। আরও দুই মেয়ের সাথে খুঁনসুটিতে মেতে উঠবে। অথবা স্কুলে হোমওয়ার্কের অভিযোগ করবে। না আর কোনদিন মায়ের কাছে কোন অভিযোগ করবে না। কিংবা মাইলস্টোনের মাঠে গিয়েও তার বন্ধুদের খেলাধূলা করবে না। যে ঘরে পড়াশোনা করতো সেখানে ঝুড়ির মধ্যে পড়ে আছে নানা ধরনের খেলনা, টেবিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বই-খাতা, টেবিল, জামাকাপড় সবই এখন কেবলই স্মৃতি। এখনো যেন এইসব কিছু আয়মানের জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু আইমান ঘরে ফিরেছে ঠিকই কিন্তু এবারের ফেরাটা ছিল ভিন্ন। টানা পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে ফিরেছে তার নিথর দেহ। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের ফিমেল হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে (এফএইচডিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আইমানের শরীরের ৪৫ শতাংশই দগ্ধ হয়েছিল। ফুটফুটে এই ছোট্ট মেয়েকে হারানোর বেদনায় বার বার জ্ঞান হারাচ্ছেন মা-বাবা,হতবিহ্বল আত্মীয়-স্বজন ও সহপাঠিরা। ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন গড়িয়ে পড়ছে অবিরত অশ্রু। গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ফুটফুটে মেয়েটির এই অকাল মৃত্যু তারা কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত আয়মান শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামের ইসমাইল হোসেন বাপ্পি ও মা আয়েশা আক্তার কানন দম্পতির সন্তান। সে মাইলস্টোন স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিল। তিন বোনের মধ্যে সে ছিল সবার বড়। আয়মানের বাবা বাপ্পি একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন। উত্তরায় নিজ বাড়িতে স্ত্রী ও ৩ কন্যা সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন তিনি।
স্কুলের ক্লাস শেষে চলছিল কোচিংয়ের ক্লাস ছিল আয়মানের। সে সময়ই বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় গুরুতর আহত হয়। পরে বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
বার্ন ইউনিটে মেয়ের মৃত্যুর শোনার পর পরই কান্নায় ভেঙে পড়েন তার মা-বাবা এবং কয়েকবার জ্ঞান হারান। তাদের কান্না দেখে আশ-পাশের মানুষের চোখে পান দেখা যায়।
কান্নাজড়িত কন্ঠে মা মা আয়েশা আক্তার বলেন, যে মেয়েকে ছাড়া আমি এক মিনিট থাকতে পারি না। এই মেয়েকে ছাড়া কিভাবে আমি বাঁচবো। ও আল্লাহ আমাকে এমন শাস্তি কেন দিলা?
আয়মানের মামা আহমেদ শামিম তার ভাগ্নির স্মৃতিচারণ করে বলেন, সে খুব মেধাবী ছিল। ভাল ছবি আকতো। সাজগোছ করতো। সবার সাথে মিশতো। বোনসহ বন্ধুদের সাথে সব সময় খেলাধুলা করতো। কত-শত স্মৃতি আছে। কোনটা রেখে কোনটা বলবো।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জনবহুল এলাকায় কেন যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তাতে দুর্ঘটনার পাশাপাশি আরও অনেকরকম ঝুঁকিও তৈরি হয়। আর যদি এ বিমান এখানে না প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো তাহলে ফুলের মত নিষ্পাপ প্রাণ গুলো এভাবে ঝড়ে পড়তো না। আর এমন ঘনবসতিপূর্ণ জায়গা বাদ দিয়ে ঢাকার বাইরে বিমান প্রশিক্ষণে দাবি জানাই।
প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ আয়মানের ইসমাইল হোসেন বাপ্পি। কাঁদতে কাদঁতে তিনি বলেন, যে মেয়েকে আমি কখনও একটু আঘাত করিনি। সেই মেয়ের শরীরটা পুড়ে গেছিল। আমার মেয়েটা অনেক কষ্ট পেয়েছে। ব্যথা যন্ত্রণায় ছফফট করছে। এমন মৃত্যু না কারও না হয়। আমার মতো অন্য কারো বুক খালি না করুক এটাই চাই।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় ইনস্টিটিউট থেকে আয়মানের মরদেহ প্রথমে
রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে নেওয়া হয়। সেখানে প্রথম জানাজা শেষে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলা নারায়ণপুর গ্রামে নেওয়া হয়। মহদেহ তার বাড়িতে পৌঁছানোর পর হৃদয়-বিদারক দৃশ্যের তৈরি হয়। এমন কোনো মানুষ নেই যে মেয়েটির জন্য কেউ কাঁদেনি। পুরো এলাকায় যেন শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। অঝোরে কেঁদেছেন বন্ধু, সহপাঠি আর প্রতিবেশিরাও।
শুক্রবার সন্ধ্যায় তাসনিমের মরদেহ আনা হয় শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামের বাড়িতে। লাশবাহী গাড়ি গ্রামে এলে স্বজনদের কান্নার রোল পড়ে যায়। প্রিয় সন্তানের মৃত্যুতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন বাবা ইসমাইল হোসেন ও মা আয়েশা আক্তার। তাঁদের আহাজারিতে চোখ ভিজে উঠছিল আশপাশে থাকা স্বজনদেরও।
ইসমাইল জানান, সোমবার সকালে মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে তিনি ব্যবসার কাজে যান।
স্বজনেরা জানান, সোমবার যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় দগ্ধ হয়ে তাসনিম ছুটে যায় শিক্ষকদের কাছে। এক শিক্ষকের মুঠোফোন দিয়ে দুর্ঘটনার কথা জানায় দাদি রুমা বেগমকে। খবর পেয়ে স্কুলে ছুটে যান বাবা ইসমাইল হোসেন ও মা আয়েশা আক্তার। প্রিয় সন্তানকে নিয়ে তাঁরা ছুটে যান রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে।
তাসনিমের মামা শামীম আহমেদ বলেন, ‘স্কুল ছুটির পর তাকে স্কুল থেকে বাসায় আনার কথা ছিল মায়ের। মেয়েকে আনতে যাওয়ার আগে তিনি দুপুরের খাবার রান্না করছিলেন। এমন সময় দুর্ঘটনার খবর শুনে স্কুলে ছুটে যান।’
শিশুটির বাবা কাঁদতে কাঁদতে বলেন,আমার বুকের মানিককে কীভাবে আমি কবরে রেখে যাব। তোমরা আমার মানিককে এনে দাও। আমি কাকে নিয়ে ছুটির দিনে ঘুরতে যাব? কাকে আমি প্রতিদিন স্কুলে আনতে যাব?’
তাসনিমের নানা নিজামুদ্দিন বলেন, ‘ওর মামার সঙ্গে এ মাসের শুরুর দিকে আমাদের বাড়িতে এসেছিল বেড়াতে। এটাই যে তার শেষ যাত্রা হবে, তা আমরা বুঝতে পারি নাই। সে বায়না ধরেছিল এরপর সে হেলিকপ্টারে চড়ে গ্রামের বাড়িতে আসবে। আমরাও কথা দিয়েছিলাম স্কুল ছুটি হলেই তাকে হেলিকপ্টারে চড়িয়ে গ্রামে নিয়ে আসব। আমার প্রিয় নানাভাই এল ঠিকই, তবে লাশবাহী গাড়িতে নিথর দেহে। কী থেকে কী হয়ে গেল, কিছুই বুঝতে পারলাম না! আল্লাহ কেন এমন করল আমাদের সঙ্গে। আমরা ওর মাকে কী জবাব দেব, কী সান্ত্বনা দেব তাকে আমি!