নিজস্ব প্রতিবেদক।।
রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। এ ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন মাইলস্টোন স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ওয়াকিয়া ফেরদৌস নিধি। হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল ঘুরেও তার খোঁজ মিলছে না।
সোমবার রাত ৮টার দিকে উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেখা হয় নিধির ভাই ফারুক হাসানের সঙ্গে।
তিনি বলেন, নিধি মাইলস্টোন স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী। এ ঘটনার পর থেকেই তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা ইতোমধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, কুর্মিটোলা হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী
মেডিকেল কলেজসহ অসংখ্য মেডিকেল কলেজে খোঁজ করেছি। কিন্তু তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে রাত ৮টার দিকেও উত্তরা আধুনিক হাসপাতালের সামনে উৎসক জনতার ভিড় দেখা গেছে। জরুরি রক্ত সরবরাহের জন্য বুথও বসানো হয়েছে। মাইকে ডেকে রক্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। হাসপাতালের গেটে রোগী আসা মাত্রই তাদের হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবকরা।
এদিকে সোমবার সন্ধ্যায় সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চারতলায় উঠে দেখা গেছে , সিঁড়ির কাছে মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে কাঁদছেন। সেখানে একটু দাঁড়াতে পাশের এক ব্যক্তি বললেন, ‘ভাই, ডিস্টার্ব (বিরক্ত) কইরেন না, প্লিজ।’
সিঁড়ির দিক থেকে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতে দেখা গেল ১০-১২ জন স্বজনকে। তাঁরা আইসিইউর (নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র) বাইরে অপেক্ষা করছেন। দুজন নারী তখন মেঝেতে বসে কাঁদছিলেন। একজন ফোনে কথা বলছিলেন, আর কাঁদছিলেন। দাঁড়িয়ে থাকা অন্যরা হতবিহ্বল, কারও মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না।
সেখান থেকে ১০ কদমের মতো দূরত্বে এক নারী মেঝেতে বসে বিলাপ করছিলেন। পাশে তিন-চারজন নারী তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এর মধ্যে আইসিইউ থেকে ডাক আসে ওই নারীর, তিনি হুড়মুড় করে ছুটে যান। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আইসিইউর সামনে থাকা আহতদের কারও সঙ্গে কথা বলার সাহস হলো না।ফলো করুন
অন্যান্য দিনের মতো সোমবার সকালে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন প্রিয় সন্তানকে। স্কুলে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে সেই সন্তানের করুণ পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না স্বজনেরা। তাঁদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠছে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পুরো এলাকা।
ইনস্টিটিউটে এক নারী মেঝেতে বসে বিলাপ করছিলেন। পাশে তিন-চারজন নারী তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এর মধ্যে আইসিইউ থেকে ডাক আসে ওই নারীর, তিনি হুড়মুড় করে ছুটে যান। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আইসিইউর সামনে থাকা আহতদের কারও সঙ্গে কথা বলার সাহস হলো না।
সেখান থেকে পাঁচতলায় দেখা গেছে, প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অনেক আহত শিক্ষার্থীর এখানে চিকিৎসা চলছে। আহত শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই শিশু।
এর আগে বেলা তিনটার দিকে ৫২০ নম্বর কক্ষের সামনে মেঝেতে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া ভাগনি মেহরিনের স্কুলড্রেস ধরে কাঁদছিলেন ফাহাদ নিয়ন। পাশে একজন নারী নিয়নকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেও কাঁদছিলেন। নিয়ন বলছিলেন, ‘ও (মেহরিন) খুব নিষ্পাপ। ও সারা দিন পড়াশোনা করে। ওর দুই হাত ও মুখ পুড়ে গেছে।’
আমার ছোট্র বাবাটার শরীর পুড়ে গেছে, মুখ হাত-পা ঝলসে গেছে, মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছে। ও -আল্লাহ – আমার বাবারটার সব কষ্ট আমাকে দিয়ে দাও। আমার বাচ্চাকে একটু শান্তি দাও। সকালে আমি এক টেবিলে বসে খাওয়াইলাম। এখন হাসপাতালে ভর্তি। কি থেকে কি হয়ে গেল। আমার সব শেষ হয়ে গেল। এভাবেই হাউমাউ করে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরী বিভাগের সামনে বসে মো. মহসিন হোসেন। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে তার ৭ম শ্রেণীতে পড়ুয়া ছেলে মাতিন হোসেনের জন্য কাদঁছিলেন। হাসপাতালের ৫২০ নম্বর কক্ষের মেঝেতে মেয়ের জন্য ধরে হাউমাউ করে মেয়ের জন্য বিলাপ করছিলেন আরেক মা ইয়াসমিন আক্তার। তার
১১ বছর বয়সী পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে নুরে জান্নাত ইউশার পিঠও পুড়ে গেছে।
তিনি জানান, আমার মেয়ের সাথে কথা হয়েছে। মেয়ে বলছে- মা শরীরের পোড়া সহ্য করতে পারছিনা। এই বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
তার কান্নায় বার্ণ ইউনিটের আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠছিলেন। কোন ভাবেই শান্তনা দিতে পারছিলেন না পরিবারের লোকজন। কান্নার এক পর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এমন অসংখ্য হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে।
সোমবার দুপুরের পর থেকেই বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আহতদের আনা হয়েছে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। একের পর এক অ্যাম্বুলেন্সে করে আসছে দগ্ধরা। তাদের সঙ্গে আসা স্বজনদের ভিড় আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বার্ন ইনস্টিটিউটের মূল চত্বর। স্বজনদের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলেরা নেতারা আহতদের হাসপাতালে দেখতে আসায় বেশ বিড়ম্বণায় পড়তে চিকিৎসক-নার্সদের । এই নিয়ে রোগীদের স্বজনদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কিছুক্ষণ পর অ্যাম্বুলেন্সে করে আহতদের আনা হচ্ছে। সেইসঙ্গে হাসপাতালে ছুটে আসছেন পরিবার-পরিজনরা। যেখানে বিমান দুর্ঘটনায় দগ্ধ ভর্তি করা হয়েছে। তাদের কারও সন্তান মারা গেছেন আবার কারও সন্তানের শরীর থেকে ৭০ শতাংশের বেশি পুড়ে গেছে, আবার কারও ৪০, ৩০, ২০ এবং ১০ শতাংশ কম- বেশি দগ্ধ হয়েছেন। এছাড়াও দূর্ঘটনার পর থেকে কারও কারও সন্তানের কোন খোঁজ পাচ্ছেন না। হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল খুঁজে প্রিয় সন্তানদের খোঁজে বার্ণ ইউনিটে ছুটে আসছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ সন্তানের খোঁজে আসেন, কেউ আসেন ছোটভাই, ভাতিজা-ভাতিজি, ভাগ্নে-ভাগ্নির খোঁজে। তাদের চোখে মুখে ছিল উৎবেগ- আর উৎকণ্ঠা। কারও কারও কান্নার থামানো যাচ্ছিল না। রোগী -স্বজন ছাড়াও হাসপাতাল জুড়েই ছিল উৎসুক জনতা ভিড়। বিশেষ করে হাসপাতালে বাইরে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মত। আর ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় চিকিৎসক-নার্সদের।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, যারা আহত হয়েছেন, তাদের বেশির ভাগই শিশু। তাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সবচেয়ে ক্রিটিকাল রোগীরা এই বার্ন ইনস্টিটিউটে আছে। অতিরিক্ত ক্রিটিক্যাল দগ্ধ রোগীদের ইনডোর ও ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।আবার অনেককেই আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এদের বেশিরভাগেরই শরীরের ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত দগ্ধ হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত বার্ণ ইউনিটে ৭০ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ জন মারা গেছেন। আর আহতের মধ্যে আইসিইউতে ৯ জন ভর্তি রয়েছেন। অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি কনফারেন্স রুম ও স্টাফ ওয়ার্ডও চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। যারা গুরুতর আহত হয়েছেন তারা হলেন- মাসুকা , বাপ্পী সরকার (৯), মাহতাব, নাফিজ, শামীম , শায়ান ইউসুফ, সায়মা, মাহিয়া , আফরান এবং মাহরিন চৌধুরী । তাদের মধ্যে কারও ৮০ শতাংশের বেশি দগ্ধ, আবার কারও ৭০, ৬০,৪০৩০,২০ এবং ১০ শতাশের বেশি বা কম দগ্ধ হয়েছেন।
মাইলস্টোন স্কুলে বিমান বিধ্বস্ত ঘটনায় ১১ বছর বয়সী আরিয়ানের সারা শরীর পুড়ে গেছে। তাকে প্রথমে বাংলাদেশ মেডিকেলে নেওয়া হয়। ওই হাসপাতাল থেকে আরিয়ানকে বার্ন ইনস্টিটিউটে পাঠিয়ে দেয় উন্নত চিকিৎসার জন্য।
এখানে জরুরি বিভাগের ভেতরে চিকিৎসা চলছিল, বাইরে বসে তার মা মনিকা আক্তার আঁখি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আল্লাহ আমার সন্তানরে আমার কাছে ফিরাইয়া দেও।
তিনি জানান, আজ আমরা ছেলে সকাল পৌনে আটটায় স্কুলে গেছে। দেড়টায় ছুটি হওয়ার কথা ছিল, এরপর দেড়টা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত কোচিং। সকালে ছেলেরে খাবার দিয়া দিছি, এরমধ্যে এই ঘটনা ঘটল।
উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের এই বাসিন্দা বলেন, সকাল বেলা সুস্থ ছেলেটা বাসা থেকে বের হইল, আমি কি অপরাধ করেছি, আল্লাহ কেন আমাকে এই শাস্তি দিল। এই বলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি।
হাসপাতালের আইসিইউর সামনে বার বার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন তৃতীয় শ্রেণি পড়ুয়া জুনায়েদ হাসানের মা ঝর্না আক্তার। তিনি জানান, সুস্থ ছেলেকে স্কুলে পাঠাইলাম এখন আমরা সোনাটা আইসিউতে। আপনারা দোয়া কইরেন। আমার ছেলের যেন কিছু না হয়। আমার ছেলের কিছু হলে আমি বাচঁবো না। এই বলে
কেঁদে দেন। জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের করিডোরে কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদের বাবা রুবেল হোসেন।
তিনি জানান, আমার ছেলে ক্লাস শেষ হলেও বৃত্তির কোচিংয়ের জন্য স্কুলে থেকে যায়। কিন্তু এক অভিশাপ বিমান দুর্ঘটনায় আজ আমার ছেলেকে নিয়ে গেল। চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেললাম। কি নিয়ে আমি এখন বাচবো। কে আমাকে বাবা বলে ডাকবে। আমার তো সব শেষ। বুক চাপড়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
জানা গেছে, তানভীর মাইলস্টোন কলেজে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র ছিল। একই স্কুলে তার ছোট ভাই তাশফিক পড়াশোনা করে। স্কুল ছুটি হওয়ায় তাকে নিয়ে বাসায় চলে যান বাবা। তবে বৃত্তির কোচিং করতে থেকে যায় তানভীর।
কাঁদতে কাঁদতে তানভীরের চাচা শাহ আলম বলেন, বৃত্তির জন্য সে কোচিং করছিল। আমার ভাতিজা কখনো প্রথম ছাড়া কখনো দ্বিতীয় হয়নি। সে অত্যন্ত মেধাবী ছিল। সে ক্লাসের ক্যাপ্টেন ছিল। আমরা প্রথমে খবর পাইনি। পরে উত্তরাসহ বিভিন্ন হাসপাতালে খুঁজেছি। পরে শুনলাম এখানে আছে। এমন বাচ্চার মৃত্যু কেমনে মেনে নেই।
জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে কিছুক্ষণ পর পর যখন কোনো অ্যাম্বুলেন্স আসছিল তখই বাঁশি দিয়ে সরিয়ে দোওয়া হচ্ছিল স্বজন ও গণমাধ্যমকর্মীদের। দগ্ধদের দ্রুত নেওয়া হয় জরুরি বিভাগে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বারবার অনুরোধ জানায়, যেসব রোগীদের অবস্থা স্থিতিশীল, তাদের স্বজনরা যেন হাসপাতালে ভিড় না করে ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখেন। এতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হবে না এবং পরিবেশ কিছুটা স্বাভাবিক থাকবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা।
বার্ন ইনস্টিটিউটের সামনে অবস্থানরত এক নিরাপত্তাকর্মী বলেন, দুপুরের পর থেকে মানুষের ভিড় বাড়ছে। এত মানুষ একসঙ্গে এসেছে যে আমরা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছি না। অনেকে কান্নাকাটি করছে, কেউ স্বজনের খোঁজে হাহাকার করছে।কিন্তু এখানে ভিড় করলে রোগীদের অবস্থা আরও খারাপ হবে। এটা আমরা কাউকে বুঝাতে পারছিনা। তবে কেউ কেউ এসেছেন স্বেচ্ছায় রক্ত দিতে। সন্ধ্যার পরও নানা বয়সী মানুষের ভিড় কমছে না, বরং বাড়তে দেখা গেল। সেই দলে নারী-পুরুষ, তরুণ, মাঝবয়সী সবাই আছেন। আহত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যাঁদের কোনো পারিবারিক সম্পর্ক নেই, কেবলই মানবিক আবেদনে সাড়া দিতে তারা এসেছিলেন।