বিপ্লবে প্রায় ১৫’শ মুমুর্ষ মানুষকে বিনামূলে রক্ত সরবারহ করেরিদম ব্লাড সেন্টার

by glmmostofa@gmail.com
নিজস্ব প্রতিবেদক।।
গত বছরের ১৫ জুলাই। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তুঙ্গে। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এলাকায়  আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর দফায় দফায় হামলা চালায় আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। লাঠিসোঁটা, রড ও কুড়াল নিয়ে আন্দোলনকারী আহতদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। আহতদের মধ্যে কয়েক’শ শিক্ষার্থী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেকে) চিকিৎসা নিতে যান। চারদিকে রোগী স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ঢামেকে এলকার বাতাস ভারি হয়ে উঠে। প্রতি সেকেন্ডে সেকেণ্ডে আহতরা আসছিলেন। আহতদের সংখ্যা যখন বেড়েই চলছিল তখনই দেখা দেয় রক্তের সংকট। ততক্ষণে ঢামেক হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক খালি হয়ে গেছে। জরুরী ভিত্তিতে অনেকের অস্ত্রপাচারের প্রয়োজন হয়ে পড়ছিল। কিন্তু চিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় রক্তের অভাবে তা করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। আহতরা শয্যায় কাতারাচ্ছেন, শরীর থেকে প্রচুর রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে। তাদের কান্নায় ঢামেকের আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠে। আহত রোগীর স্বজন থেকে শুরু করে বন্ধু-বান্ধব আত্মীয় স্বজরা  ছুটাছুটি করতে থাকেন এক ব্যাগ রক্তের জন্য। একদিকে রোগীরা হাসপাতালের আর সামাজিক যোগাযোগ্য মাধ্যম ফেসবুক বিভিন্ন জায়গায়   যোগাযোগ করেও যখন এক ব্যাগ রক্তের জন্য হাহাকার করছিলেন ততক্ষণে রাত গভীর হয়ে যায়। ঠিক ওই সময়ে ফোন আসে রিদম ব্লাড সেন্টারে। ঢামেকের একজন চিকিৎসক ফোন করে জানান, এই মুহুর্তে রোগীদের বাঁচাতে প্রচুর রক্তের প্রয়োজন। আমরা রক্তের অভাবে অপারেশন করতে পারছি না। তখনই মানুষের জীবন বাঁচাতে ত্রাতা হয়ে আসেন   স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন রিদম ব্লাড সেন্টার। আর এভাবেই জুলাই বিপ্লবের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এই অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি।
জানা গেছে, গত বছরের ১৫ জুলাই থেকে শুরু করে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আহত গুলিবিদ্ধ ৭০০ জনকে রক্ত দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন রিদম ব্লাড সেন্টার। আন্দোলনে সব মিলিয়ে প্রায় ১৫’শ মানুষকে বিনামূলে রক্ত দিয়ে সহযোগতা করেছেন। এর মধ্যে এ ব্লাড ব্যাংক ১৮ থেকে ২২ জুলাই আহতদের ১২০০ ব্যাগ রক্ত সরবরাহ করেছিল। জুলাই বিপ্লবে আহতদের রক্ত ও চিকিৎসাসেবা দিতে একঝাঁক নির্ভীক চিকিৎসক, নার্স এবং  রক্তের ঘাটতি মেটাতে রিদম ব্লাড ব্যাংকের কতটা ভূমিকা রেখেছিল সম্প্রতি এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমও জানিয়েছেন।বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, রাজধানীর নিউ এলিফ্যান্ট রোডের কাঁটাবন মোড়ে ২৩৪/ডি খাইরুন্নেসা ম্যানসনের দ্বিতীয় তলা ছোট তিন রুমের মধ্যে চলছে রিদম ব্লাড সেন্টারের কার্যক্রম। প্রথমে ঢুকতেই রিসিপশন তার পর ব্লাড কানেকশান রুম এবং ল্যাব রুম। যদিও ঢাকায় কিংবা ঢাকার বাইরে এ সংগঠনের কোন অফিস নেই। ২২ জনের মতো কর্মচারি রয়েছে। তারা বিভিন্নভাবে সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এছাড়াও চিকিৎসকদের একটি বিশাল টিম রয়েছে যারা সার্বক্ষনিকভাবে সহযোগিতা করে চলেছেন।
সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, সূস্থ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। যা বাংলাদেশ ট্রাস্ট্রের একটি অলাভজনক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এ সংগঠনের লক্ষ্য নিরাপদ রক্ত সংগ্রহ এবং সরবরাহের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবায় রক্তের প্রয়োজনীয়তা পূরণে সহায়তা করে মুমূর্ষু ও অসুস্থ মানুষের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে ভুমিকা রাখা।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান প্রভৃতিসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপিং এবং স্বেচ্ছায় রক্তদানের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা রিদম্‌ ব্লাড ব্যাংক একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। যা একদল দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত। এছাড়াও নিরাপদ রক্ত সংগ্রহ এবং সরবরাহ করা  স্বেচ্ছায় রক্তদানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে লিফলেট ও বিভিন্ন প্রচার অভিযান চালানো হয়। বর্তমানে এ সংগঠনের ডোনার সংখ্যা এক লাখের বেশি। এ সংগঠনে ৫০ সদস্যেও বেশি চিকিৎসক রয়েছেন। যারা বিভিন্নভাবে এ সংগঠনকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখছেন।
জুলাই বিপ্লবের ভূমিকা প্রসঙ্গে সংগঠনের এডমিন অফিসার মো. আবু হানিফ  বলেন, আমরা মূলত ১৫ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কার্যক্রম শুরু করি। পরে যখন আন্দোলন আরও তীব্র হয় তখন রোগীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। এ পর্যায়ে আমরা আমরা সিদ্বান্ত নেই ঢামেকে মেডিকেলে আমরা অস্থায়ী ক্যাম্প করবো। পরে আমরা ১৮ জুলাই থেকে অস্থায়ী ক্যাম্প করি। ১৫ সদস্যের এই ক্যাম্পে অনেক চিকিৎসকও ছিলেন।
আন্দোলনের সেই সময়ে স্মৃতি চারণ করে তিনি বলেন, ১৮ এবং ১৯ জুলায়ে ঢাকা মেডিকেলের পরিস্থিতি ছিল ভয়ংকর। কেউ না দেখলে তা বিশ্বাস করানো কঠিন।  চতুর্দিকে গোলাগুলি-সংঘর্ষ। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর চলেছে নির্বিচার গুলি।কারও মুখে, মাথায়, কানে, কারো পায়ে, বুকে- পেটে শরীরের বিভিন্ন অংশে গুলি লেগে ছিদ্র হয়ে গেছে। আবার কারো ফুসফুসে গুলি লাগছে, কারো গুলি লেগে হার্ট ছিদ্র হয়ে গেছে। এমনকি কারো চোখে গুলি ডুকে গেছে। কারো গায়ে গুলি ১০টি, কারো ১৫ থেকে ২০টি। এই সব গুলিবিদ্ধ একের পর এক আসছে।  ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের  ইমার্জেন্সি, আইসিইউ, সাধারণ ওয়ার্ড সবখানেই ছিল আন্দোলনে আহতরা। তাদের বেশির ভাগই ছিল গুলিবিদ্ধ। তাদের মধ্যে শিক্ষার্থী, পথচারী, ব্যবসায়ী, রিকশাচালকসহ নানা পেশার মানুষ রয়েছেন।ঝাঁঝরা শরীর থেকে প্রচুর রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে। গুলিবিদ্ধ আহতরা কাতরাচ্ছেন এক ব্যাগ রক্তের জন্য। চিকিৎসকরা রক্তের অভাবে অস্ত্রপাচার করতে পারছে না। অনেকেই মারা যাচ্ছে। রোগী স্বজনরা রক্তের জন্য পাগলের মতো ছুটছে। তখন স্চ্ছোসেবী সংগঠন হিসেব আমারদের দ্বায়িত্ব ছিল মানুষকে রক্ত দিয়ে সাহায্য করা। তখন আমরা চেষ্টা করেছি রক্ত দিয়ে যতটা সম্ভব সাহায্য করতে।

মো. আবু হানিফ বলেন, আমরা মনে ওই সময় আমরা যদি মানুষকে রক্ত না দিয়ে সাহায্য করতে তাহলে হয়তো রক্তের অভাবে আর দেড় থেকে দু’শো মানুষ বেশি মারা যেত।  এই সংকটকালে ঢামেকে আসার রোগীর স্বজন থেকে শুরু করে কর্মচারিরা এলাকার মানুষ , চিকিৎমক ওয়ার্ডবয়, নার্স সাংবাদিকসহ বিভিন্ পর্যায়ে মানুষ ছুটে আসেন রক্ত দিতে।  এমনকি হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষও এগিয়ে এসে রক্ত দান করেছেন। এই সব মানুষদের অনেকেই জানতো তাদের রক্তের গ্রুপ কি। আমরা তখন রক্তের গ্রুপ নির্ণয়সহ যাতে দ্রুত রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় তার চেষ্টা করেছি। এজন্য অসংখ্য ডাক্তারের ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মত। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অনেকই নতুন জীবন পেয়েছে। তাতেই আমাদের সংগঠনের স্বার্থকতা।
জুলাই আন্দোলনে সেই দিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বিষয়ে রিদম সেন্টারের পরিচালক ডা. এস এম মামুন  বলেন, বিপ্লব চলাকালে তীব্র মানসিবক সংকট দেখা দেয়। সময়মতো রক্তের  অভাব বেড়েই চলছিল। জীবন বাঁচানো তাগিদে পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে গত বছরের ১৮ জুলাই ঢামেকে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা কার্যক্রম, আহতদের হাসপাতালে পৌছে দিতে এ্যাম্বুলেন্স সেবা, সেচ্ছায় রক্তদানসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে রিদম।
তিনি বলেন,জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই কাজে অংশ নেয় ২৫০ জনের বেশি চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থী এবং ৮৫ জন স্বেচ্ছাসেবী। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ১৮ থেকে ৩৬ জুলাই পর্যন্ত অসংখ্য মানুষের সাহায্য পেয়েছি। তারা রক্তসহ বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন ফলে অসংখ্য মানুষের জীবন বাচাঁনো সম্ভব হয়েছে ।

You may also like

সম্পাদক : হামীম কেফায়েত

গ্রেটার ঢাকা পাবলিকেশন নিউমার্কেট সিটি কমপ্লেক্স ৪৪/১, রহিম স্কয়ার

নিউমার্কেট, ঢাকা ১২০৫

যোগাযোগ : +8801712813999
ইমেইল : news@pran24.com