নিজস্ব প্রতিবেদক।।
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার ২১ বছরের যুবক নাহিদ হোসেন। দুই বছর আগে এইসএসসি পাশ করে। অর্নাসে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সব কিছুই যখন ভাল চলছিল হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে সে। কথায় কথায় রেগে যায়। কোন কিছুই বললেই ঘরে ভাংচুর শুরু করে। একা একাই আবল-তাবোল বলতে শুরু করে। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনষ্টিটিউট ও হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সেখানেই কথা হয় তার বাবা নূরুজ্জামানের সঙ্গে।
তিনি জানান, প্রথম কয়েকদিন অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে। তখন আমরা বিষয়টি বুঝতে পারিনি। হয়ত বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিও জন্য প্রচুর টেনশনে ছিল, আমরা এমনটাই ভেবেছিলাম। কিন্তু একপর্যায়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। তখন গ্রামে ঝাড়-ফুঁ থেকে শুরু ডাক্তারি-কবিরাজি সবকিছুই করেছি। যে যেখানে বলেছি সেখানেই গিয়েছি কিন্ত ভাল তো হয়নি বরং জমানো টাকাসহ জমি-জমা যা ছিল, সব শেষ করে নি:স্ব হয়ে গেছি। এর পর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেই। একবছর ধরে এখান থেকে চিকিৎসা নিচ্ছি। কিছুদিন ভাল থাকে তারপর আবার শুরু করে পাগলামি। ঘর থেকে বের হয়ে যায়। শরীরের কাপড় রাখে না। মানুষকে মারধর শুরু করে। ছেলেকে নিয়ে খুবই সমস্যায় আছি। শুধু এই ভুক্তলোগী পরিবার নয়, রাজধানীর মানসিক হাসপাতালে আসা একাধিক রোগীর পরিবারে সদস্যরা জানান, প্রথমে তারা স্বাভাবিকভাবেই দেখেছেন। তাই সঠিক চিকিৎসা না দিয়ে ঝাড়-ফুঁসহ তাবিজ-কবজের আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু অবস্থার অবনতি হতে থাকলে তখন চিকিৎসকের আসছেন। এই পর্যায়ে আবার অনেকেই এক হাসপাতালে থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতেই সর্বশান্ত হয়ে যাচ্ছেন।
চিকিৎসকরা জানান, দেশের ১৮ শতাংশ বা প্রায় ৩ কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে মানসিক রোগে আক্রান্ত। আবার মানসিক সমস্যায় ভুগলেও প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ শতাংশই কোন চিকিৎসা নেয় না। আর বিষণ্ণতায় ভোগেন ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ মানুষ। আবার শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক রোগের হার ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। এছাড়াও রোগীর তুলনায় চিকিৎসা ব্যবস্থাও অপ্রতুল এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নিউরোসাইকিয়াট্রিস্ট বা স্নায়ু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও নার্সসহ জেলা কিংবা উপজেলায় কোন চিকিৎসক নেই। ফলে রোগীদের একটি বড় অংশ চিকিৎসা সেবার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
তারা জানান, মানসিক রোগগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো- উদ্বেগ, আতঙ্ক, সামাজিক ভয়, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, সূচিবায়ু, নিদিষ্ট জিনিসে ভয় বা ফোবিয়া, হিস্টিরিয়া এবং ঘুমের সমস্যা ইত্যাদি। এছাড়াও ব্যক্তিগত, পারিবারিক, দারিদ্র্য, সহিংসতা, সামাজিক বৈষম্যের কারণে মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।বিশেষ শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক রোগের হার বাড়ার কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। তবে অনেক ধরনের মানসিক রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাই মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় একীভূত করতে হবে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত মানসিক রোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করার পরামর্শ। এ অবস্থায় আজ শুক্রবার বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘বিপর্যয় কিংবা জরুরি অবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যেন পাওয়া যায়’।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ দেখা গেছে, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক রোগে ভুগছেন ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। আর বিষণ্নতায় ভুগছেন (ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডার) ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। উদ্বেগ জনিত রোগে (এ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার) ৪ দশমিক ৭ শতাংশ,সোমাটিক সিমটম ডিজঅর্ডারে ২ দশমিক ৩ শতাংশ, অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডারে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ, বাইপোলার ডিজঅর্ডারে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ, সিজোফ্রেনিয়া ও অন্যান্য সাইকোটিক ডিজঅর্ডার এক দশমিক শূণ্য শতাংশ, মাদকাসক্তি রোগে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ,শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক রোগের হার ১২ দশমিক ৬ শতাংশ, শিশু-কিশোরের নিউরোডেভলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারে ৫ দশমিক ১ শতাংশ, শিশু-কিশোরের মাঝে উদ্বেগ জনিত রোগ (এ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার) ৪ দশমিক ৭ শতাংশ
এবং শিশু-কিশোরের কনডাক্ট ডিজঅর্ডারে ভুগছেন এক দশমিক ৭ শতাংশ।
দেশের মানসিক স্বাস্থ্যের জনবল রয়েছে প্রতি এক লক্ষ জনসংখ্যার জন্য শূণ্য দশমিক ৫০ জন। সাইকিয়াট্রিস্ট (মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ) রয়েছেন প্রায় ৩৫০ জন (প্রতি এক লক্ষ জনসংখ্যার জন্য শূণ্য দশমিক ১৭ জন), সাইকোলজিষ্ট ৫৬৫ জন (প্রতি এক লক্ষ জনসংখ্যার জন্য শূণ্য দশমিক ৩৪ জন) এবং সাইকিয়াট্রিক সোসাল ওয়ার্কার ৭ জন, (প্রতি এক লক্ষ জনসংখ্যার জন্য শূণ্য দশমিক শূণ্য শূণ্য জন)।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. তাইয়েবুর রহমান রয়েল বলেন, প্রতিটি দুর্যোগে মানুষ যেমন শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তেমনি তার ওপর মানসিক চাপও সৃষ্টি হয়। এতে পরবর্তীতে তার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের রোগ তৈরি হতে পারে। বিষন্নতাজনিত হতাশা একিউট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার ও পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারের মতো রোগ সৃষ্টি করে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ ধরনের রোগকে আমলে নেয়া হয় না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে যারা এ ধরনের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হন, তাদের চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে এক পর্যায়ে তারা স্থায়ী মানসিক রোগীতে পরিণত হন। ব্যক্তির নিজের ও পরিবারের ওপর চাপ তৈরি হয়। দুর্যোগ কবলিত এলাকাগুলোয় পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি কর্মসূচির অংশ হিসেবে সেখানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী কাউন্সেলরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সেখানে পদায়ন করতে হবে। যারা এ ধরনের পরিস্থিতিতে আক্রান্তদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করবেন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ব্যক্তির ওপর বিভিন্নভাবে মানসিক প্রভাব ফেলতে পারে যেমন; দুর্যোগের আকস্মিকতা ও ধ্বংসযজ্ঞের কারণে মানুষ শক, ভয় এবং বিভ্রান্তি অনুভব করেন। বাড়িঘর, কাজ বা প্রিয়জন হারানোর অনুভূতি মানুষকে অসহায় করে তোলে। দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব হিসেবে দুর্যোগের ভয়াবহ স্মৃতি বারবার ফিরে আসা, ঘুমের ব্যাঘাত এবং অতিরিক্ত সতর্কতার মতো সমস্যা দেখা দেয়। দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি ও অনিশ্চয়তা থেকে দীর্ঘদিন ধরে বিষন্নতা ও উদ্বেগ তৈরি হয়। মানসিক চাপ ও হতাশা কমাতে অনেকে অ্যালকোহল বা মাদকদ্রব্যের আশ্রয় নিতে পারে। পরিবার বা সমাজে বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতা দেখা দিতে পারে। বাড়িঘর হারিয়ে অন্য জায়গায় আশ্রয় নেওয়া মানুষকে মানসিক চাপে রাখে। ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তা মানুষের মনে ভীতি তৈরি করে।
এ ব্যাপারে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. ফাহমিদা আহমেদ বলেন, আমাদের দেশে জনসংখ্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা আনেক বেশি। তাই অনেকেই হেলথ সাপোর্ট পেলেও মানসিক সার্পোটগুলো খুবই কম পায়। আবার কাউন্সিলার এবং সাইকিয়াট্রিস্টের প্রয়োজন তুলনায় অনেক কম। মানুষ আসলে শাররিক চিকিৎসার জন্য যতটা গুরুত্ব দিচ্ছে কিন্তু মানসিক চিকিৎসায় ততটা গুরুত্ব পাচ্ছে না।
৫ আগস্টের ঘটনার উদারহণ দিয়ে তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থী চোখের সামনে গুলি, মৃত্যুর মত ভয়াবহ ঘটনা দেখেছে। অনেকেই গুরুতর আহত হয়েছে, কেউ পঙ্গু হয়েছে, কারও চোখ নষ্ট হয়েছে কিংবা অঙ্গহানির মতো ঘটনা ঘটেছে। আমাদের কাছে অনেকেই চিকিৎসা নিতে এসেছেন। আমরা দেখেছি- তারা পড়াশোনা মন বসাতে পারছে না। ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখেন। ওই ঘটনা মনে করিয়ে দিতে পারে এমন যেকোনো কিছু শুনলে বা দেখলে তীব্র প্রতিক্রিয়া, আতঙ্ক, উদ্বেগ বোধ করেন, চমকে ওঠেন। তারা আর আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারছে না। তাদের লাইফ স্টাইল থমকে গেছে। পরিবার কিংবা বাবা-মা সেইভাবে সার্পোট দিতে পারছে না। হয়তো পড়াশোনা কিংবা চাকরি করছে কিন্তু তারা অনেক ভুক্তভোগী। সেই ট্রমা থেকে বের হতে পারছে না। পারিবারিক সহিংসতা, কারো মৃত্যুতে তীব্র মানসিক আঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সহিংস কোন ঘটনার স্বাক্ষী হলে অনেকেই ট্রমায় ভোগেন। এ অবস্থায় অবশ্যই কাউন্সেলিং করতে হবে। আর কাউন্সেলিং করলে সে সব মানুষ দেখা গেছে আগের অবস্থায় ফিরে আসছে।