দক্ষতা- মেধা ও একক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতে বিরল এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ডা. শীর্ষ শ্রেয়ান। নিজ উদ্যোগে আন্তর্জাতিক চ্যারিটি সংস্থা ডিরেক্ট রিলিফ থেকে প্রায় ১৭ কোটি টাকার ওষুধ অনুদান এনে আলোচনায় এসেছেন তিনি। ‘অ্যাল্টেপ্লেস’ নামক জীবনরক্ষাকারী ও ব্যয়বহুল ওষুধ সরবরাহের মাধ্যমে স্ট্রোক ও হৃদরোগের বহু রোগীর চিকিৎসা এখন হয়ে উঠবে অনেক সহজলভ্য।
কীভাবে মাত্র পাঁচ মাসের প্রচেষ্টায় সম্ভব হলো এমন এক অসাধারণ উদ্যোগ? কী ছিল প্রক্রিয়াটির পেছনের গল্প?—এসব নিয়েই কথা বলেছেন ডা. শীর্ষ শ্রেয়ান।
প্রশ্ন : উদ্যোগের সূচনা কিভাবে?
ডা. শীর্ষ শ্রেয়ান: আমি তখন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ৫ম বর্ষের শিক্ষার্থী। সে সময়ে ওয়ার্ল্ড স্ট্রোক অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউএসও) ‘ফিউচার স্ট্রোক লিডারস কোহর্ট-২’-এর উদ্যোগে নেওয়া গবেষণা প্রকল্প ‘গ্লোবাল কাভারেজ অব টেলি-স্ট্রোক সার্ভিস’-এ কাজের সুযোগ পাই। সেখানে আমি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে ছিলাম। আমার সঙ্গে হাইডেলবার্গের একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীও যুক্ত ছিলেন।
আমাদের গবেষণাপত্রটি ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব স্ট্রোকে প্রকাশিত হয় এবং ২০২৪ সালের অক্টোবরে ওয়ার্ল্ড স্ট্রোক একাডেমি থেকে ‘বেস্ট পেপার’ (পেপার অব দ্য মান্থ) হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
সেই সূত্রেই ডিরেক্ট রিলিফের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিচালক গর্ডন উইলহক আমার সাথে যোগাযোগ করেন এবং রাজশাহী মেডিকেলে অ্যাল্টেপ্লেস ওষুধের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানতে চান। এইভাবেই মূলত আমাদের যোগাযোগের সূচনা হয়।
প্রশ্ন : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি কিভাবে জানান?
ডা. শীর্ষ শ্রেয়ান: বিষয়টি জানার পর আমি আমাদের ফ্যাকাল্টি মহোদয়দের অবগত করি। বিশেষভাবে মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. আজিজুল হক আজাদ স্যার ও হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফ এম শামীম আহাম্মদ স্যারের সহযোগিতা ছিল অনন্য। আজাদ স্যার শুধু উৎসাহ দেননি, বরং পুরো প্রক্রিয়ায়—প্রথম যোগাযোগ থেকে শুরু করে অনুমোদন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।
এরপর ডিরেক্ট রিলিফের সঙ্গে আমাদের একটি ভার্চুয়াল মিটিং হয়। সেখানে আমরা হাসপাতালের সার্বিক চিত্র তুলে ধরি—বিশেষ করে স্ট্রোক ও কার্ডিওলজির রোগীর সংখ্যা এবং আমাদের ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইত্যাদি। তারা আমাদের উপস্থাপন শুনে একটি আবেদন ফর্ম পাঠায়, যেটির মাধ্যমেই মূল প্রক্রিয়াটি শুরু হয়।
প্রশ্ন : কিভাবে আবেদন করা হয়?
ডা. শীর্ষ শ্রেয়ান: আবেদন প্রক্রিয়াটি অনেকটাই জটিল এবং সময়সাপেক্ষ ছিল। এটি মূলত ছিল একটি পার্টনারশিপ ফর্ম, যেখানে প্রায় ১৯টি বিস্তারিত প্রশ্ন ছিল। সাধারণ ‘হ্যাঁ/না’ ধরনের কিছুই ছিল না, প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে হয়েছে। যেমন—আমাদের হাসপাতালে ওষুধ সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত ড্রাগ স্টোরেজ ক্যাপাসিটি আছে কি না, চেইন অব কন্ট্রোল বজায় রাখতে পারবো কি না, কোনো আন্তর্জাতিক বা স্থানীয় অংশীদার প্রতিষ্ঠান রয়েছে কি না, এই অনুদান পরিচালনা করার মতো সক্ষমতা আছে কি না, কিংবা হাসপাতালের রোগীর চাপ কত ইত্যাদি।
এই তথ্যগুলো শুধু লিখিতভাবে জানানোই নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করাও জরুরি ছিল। প্রতিটি প্রশ্নেই সতর্কতার সঙ্গে উত্তর দিতে হয়েছে, যেন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ফর্মটি গ্রহণযোগ্য হয়।
এই কার্যকর যোগাযোগ ও বিশ্বাসযোগ্য উপস্থাপনার ভিত্তিতেই ডিরেক্ট রিলিফের সঙ্গে আমাদের একটি পার্টনারশিপ গড়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে আরও এমন কিছু কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রশ্ন : অ্যাল্টেপ্লেস ওষুধটি কী কাজে ব্যবহৃত হয়?
ডা. শীর্ষ শ্রেয়ান: অ্যাল্টেপ্লেস মূলত স্ট্রোক ও হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। স্ট্রোকে যখন মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বেঁধে যায়, এটি সেই জমাট গলিয়ে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করে। আর হৃদরোগের ক্ষেত্রেও এটি বেশি কার্যকর ওষুধ। বিশেষ করে যেসব রোগীর অ্যাকিউট মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (হার্ট অ্যাটাক) হয়, তাদের চিকিৎসাতেও এটি অত্যন্ত উপকারী।
একজন রোগীর জন্য এই ওষুধের বাজারমূল্য প্রায় ৬০–৬৫ হাজার টাকা। অথচ অনুদানের ফলে এখন এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে রোগীদের দেওয়া সম্ভব।
প্রশ্ন: প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে কতটা সময় লেগেছে?
ডা. শীর্ষ শ্রেয়ান: প্রথম যোগাযোগ শুরু হয়েছিল মার্চের মাঝামাঝি। আর ওষুধ হাতে পেয়েছি আগস্টের শেষদিকে। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লেগেছে প্রায় পাঁচ মাস। ডা. আজাদ স্যার অত্যন্ত যত্নসহকারে প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করেছেন—ডকুমেন্টেশন, সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ, ফর্ম পূরণ—সবকিছু তিনি তদারকি করেন।
ওষুধগুলো এসেছে নেদারল্যান্ডস থেকে। ২০ আগস্ট কাস্টমসে পৌঁছায় এবং ২৫ আগস্ট আমরা হাতে পাই। কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স থেকে শুরু করে রাজশাহী পর্যন্ত পরিবহন ব্যয়ও ডিরেক্ট রিলিফই বহন করেছে।
প্রশ্ন : স্ট্রোক নিয়ে কাজ করার আগ্রহ কেন?
ডা. শীর্ষ শ্রেয়ান: আমি যখন মেডিকেলে তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তখন থেকেই আমার নিউরোলজি ভালো লাগতো। বিশেষ করে ওয়ার্ডে স্ট্রোক রোগীদের অবস্থা দেখতাম। স্ট্রোকের হারটা এতো বেশি যে আকস্মিকভাবে একটা মানুষ খারাপ হয়ে যায় এবং পুরো পরিবারের অবস্থা বিপর্যস্থ হয়ে যায়। আমার অভিজ্ঞতা বলছে—স্ট্রোক রোগীদের ক্ষেত্রে সময়ই সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। বিশেষ করে সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলে চিকিৎসার ফল সবচেয়ে ভালো হয়।
এক্ষেত্রে অ্যাল্টেপ্লেস একটি কার্যকর ওষুধ, যা রোগী সময়মতো পেলে তাদের জন্য বড় ধরনের সহায়তা হতে পারে। চীনের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে—২৪ ঘণ্টার মধ্যে অ্যাল্টেপ্লেস প্রয়োগ করলে মৃত্যুহার প্রায় ৯০% কমে যায়।
আমি বিশ্বাস করি, সময়মতো চিকিৎসা পেলে হুইলচেয়ারে করে আসা একজন রোগীও সুস্থ হয়ে নিজের পায়ে হেঁটে বাসায় ফিরতে পারেন।
প্রশ্ন: মহৎ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পেরে অনুভূতি কেমন?
ডা. শীর্ষ শ্রেয়ান: ব্যক্তিগতভাবে আমি খুবই আনন্দিত—আমাদের পাঁচ মাসের পরিশ্রম সফল হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, যদি রাজশাহীর সাধারণ মানুষ বিপদের সময় এই ওষুধ দ্রুত ও সঠিকভাবে পেতে পারেন, তাতেই আমাদের আনন্দটা পূর্ণতা পাবে। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন, যেন আমরা রোগীদের পাশে দাঁড়াতে পারি।
প্রশ্ন : ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও পরিকল্পনা কী?
ডা. শীর্ষ শ্রেয়ান: আমি এখন যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ জেরিয়াট্রিকস সোসাইটির গবেষণা ও একাডেমিক কমিটির একমাত্র নন-ইউকে সদস্য হিসেবে কাজ করছি। আমার দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্ন—বাংলাদেশ একদিন নিজেই অ্যাল্টেপ্লেসসহ জীবনরক্ষাকারী দামি ওষুধ উৎপাদন করবে। তখন কেবল নিজেদের চাহিদা নয়, বরং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশকেও সহায়তা করতে পারবে।
বিদেশি দান বা অনুদানের ওপর নির্ভর না করে, আমরা যেন চিকিৎসাক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন করতে পারি।
প্রশ্ন : আপনার বেড়ে উঠার গল্প জানতে চাই।
ডা. শীর্ষ শ্রেয়ান: আমার বেড়ে ওঠা মূলত ঢাকার সাভারে। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে এখানেই। আমি এসএসসি ও এইচএসসি সম্পন্ন করেছি সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে।
আমার বাবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত, আর মা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজের কলেজ শাখায় সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন। পরিবারের এই একাডেমিক পরিবেশ আমাকে সবসময়ই শিক্ষা ও মানসিক বিকাশে উৎসাহ জুগিয়েছে।সূত্র:মেডিভয়েস।