চিকিৎসা ব্যবস্থায় নেই গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট, বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি 

বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস আজ

by glmmostofa@gmail.com

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

সারা  বিশ্বের উন্নত স্বাস্থ্যসেবায় একমাত্র গ্রহণযোগ্য মডেল হলো ডাক্তার- নার্স- ফার্মাসিস্ট। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিকিত্সক, নার্স ও হেলথ টেকনোলজিস্ট থাকলেও একজনও গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নেই। এতে মানুষের নিরাপদ ও মানসম্পন্ন ওষুধ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে, ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার, ভুল ওষুধের ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বাড়ছে।

ফার্মাসিস্ট তাঁরাই, যাঁরা শুধু ওষুধ নিয়ে পড়াশোনা করেন না, ওষুধের গুণাগুণ, মান যাচাই, ওষুধের ডোজ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ভালো-মন্দ সবকিছু বিচার করার ক্ষমতা রাখেন। দেশের ৯০-৯৫ ভাগ ফার্মাসিস্ট বর্তমানে ওষুধ কম্পানিতে চাকরি করে থাকেন। সরকারি হাসপাতালে রোগীর সেবায় কোথাও গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের রাখা হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগীর ওষুধবিষয়ক জিজ্ঞাসা যেমন-ডোজ বা মাত্রা, মাত্রার সমন্বয়, ওষুধ সেবনের নিয়ম, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসহ যাবতীয় নির্দেশ রোগীকে দিয়ে থাকেন একজন ফার্মাসিস্ট। দেশের সরকারি হাসপাতালে রোগীর সেবায় গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট না থাকায় একদিকে রোগীরা শারীরিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে কার্যকারিতা হারাচ্ছে ওষুধের। বেশির ভাগ ফার্মেসিতে মানা হচ্ছে না তাপমাত্রা অনুযায়ী ওষুধ সংরক্ষণ।

এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস-২০২৫। এ বছর ওয়ার্ল্ড ফার্মাসিস্ট সোসাইটির উদ্যোগে দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘স্বাস্থ্য সেবায় ফার্মাসিস্টদের ভাবনা’।

এই প্রতিপাদ্যে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবার ওপর ফার্মাসিস্টের ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। পেশাজীবী ফার্মাসিস্টদের মধ্যে সংহতি ও একাত্মতা জোরদার করার কথা বলা হয়েছে। দিবসটি উদযাপনে সরকারি-বেসরকারিভাবে নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

অথচ ২০১৯ সালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, সরকারি হাসপাতালের ফার্মেসিতে একজন ও অন্তর্বিভাগে প্রতি ৫০ শয্যার বিপরীতে একজন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট থাকতে হবে। কিন্তু গত চার বছরেও এই নিয়ম বাস্তবায়ন করা হয়নি।

বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. আসিফ হাসান বলেন, ‘আমার জানা মতে, বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের রাখা হয়নি। এতে আমাদের রোগীরা ফার্মেসি সেবা থেকে বঞ্চিত। তারা ওষুধের ব্যবহারবিধি জানতে পারছে না। অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে।’

মো. আসিফ হাসান বলেন, সরকারি হাসপাতালে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট রয়েছেন, তারা ওষুধের গুণাগুণ, মান যাচাই, ওষুধের ডোজ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এসব বিষয়ে জ্ঞ্যান রাখেন। এছাড়া চিকিত্সকের সহকারি হিসেবে কাজ করতে হলে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট প্রয়োজন। আমাদের বেশিরভাগ ফার্মাসিস্ট ওষুধ কম্পানিতে চাকরি করে থাকেন। এর বাইরে কিছু আছে যারা উন্নত করপোরেট হাসপাতালে চাকরি করেন।

ফার্মাসি কাউন্সিলের তথ্য মতে, দেশে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের সংখ্যা ১৮ হাজার ৯২১। ডিপ্লোমাধারী ফার্মাসিস্ট পাঁচ হাজার ৭৩১ এবং ফার্মেসি টেকনিশিয়ান রয়েছেন এক লাখ ৪৮ হাজার ২০২ জন।  দিনে ২০ লাখ মানুষ ওষুধ কেনে ফার্মেসি দোকানদারের কাছ থেকে; যিনি তিন মাসের কোর্স করে ফার্মেসি চালাচ্ছেন। এর বাইরে কম শিক্ষিত লোকও ওষুধের দোকান পরিচালনা করছেন।

চিকিত্সকের  ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অযাচিত ওষুধ ব্যবহার কমাতে দেশে ‘ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেস ফর হেলথের বেটার হেলথ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রকল্পের  অধীনে ফার্মেসি টেকনিশিয়ানদের প্রশিক্ষন দেওয়া হলেও বর্তমানে ফান্ড সংকটে প্রকল্পটি বন্ধ রয়েছে। এ প্রকল্পের  কারিগরি উপদেষ্টা রাইয়ান আমজাদ  বলেন,  উন্নত দেশে স্বাস্থ্য সেবা প্রধান করা হয় ডাক্তার- নার্স- ফার্মাসিস্টের সম্বনয়ে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য সেবায় ফার্মাসিস্টের ভুমিকা অনুপস্থিত। এর ফলাফলে দেখা যায়, চিকিত্সক ও নার্সের কাজের চাপ বেড়ে যাচ্ছে। যেমন- একজন ক্যান্সার চিকিত্সায় রোগীকে অনেক ওষুধের সম্বনয় করতে হয়। প্রতিটি রোগী জন্য আলাদাভাবে ওষুধ ঠিক করে দেয় চিকিসক। অথচ এ কাজটি ফামার্সিস্টদের।

তিনি বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে উন্নত দেশের স্ট্যান্ডার্ড হলো, ১০ হাজার মানুষের জন্য ২.৫টি ফার্মেসি থাকবে। বাংলাদেশে ১০ হাজার মানুষের জন্য ১৯টির বেশি ফার্মেসি রয়েছে। আইন অনুযায়ী প্রতিটি ফার্মেসি একজন পরিদর্শক দুইবার পরিদর্শন করবেন। কিন্তু আমাদের ওষুধ প্রশাসনে মাত্র কয়েকজন পরিদর্শক আছেন। যে কারণে এই ফার্মেসিগুলোতে তদারকি হয় না।  আমরা যদি এই ফার্মেসিগুলো কমিয়ে আনতে পারি, তবে তা ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে।’

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা) অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান বলেন, মানুষের নিরাপদ ও মানসম্পন্ন ওষুধ প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য ফার্মাসি নেটওয়ার্ক তৈরির কথা ভাবছে মন্ত্রণালয়। প্রাথমিকভাবে সারা দেশে সরকারি ৭০০ হাসপাতালে এই ফার্মেসি করা হবে। পাশাপাশি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ বেশি পরিমাণে উত্পাদনে জোর দিচ্ছে সরকার।

তিনি বলেন,  মুদিদোকান আর ফার্মেসি এক জিনিস নয়। ওষুধ দেওয়া একটি বিশেষায়িত কাজ। এর জন্য চাই ফার্মাসিস্ট। এই খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁরা। স্বার্থের দ্বন্দ্ব যেন না থাকে, সে জন্য ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে চিকিত্সকদের সব ধরনের উপহার নেওয়া বন্ধের আইনি ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

You may also like

সম্পাদক : হামীম কেফায়েত

গ্রেটার ঢাকা পাবলিকেশন নিউমার্কেট সিটি কমপ্লেক্স ৪৪/১, রহিম স্কয়ার

নিউমার্কেট, ঢাকা ১২০৫

যোগাযোগ : +8801712813999
ইমেইল : news@pran24.com