নিজস্ব প্রতিবেদক।।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেছেন, ওষুধ বা মেডিকেল কলেজ নিয়ে সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিবের ((মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর) বক্তব্য তার ব্যক্তিগত মতামত, এটাকে দলীয় মনে করি না। যদিও উনি দলীয় মহাসিচব হিসেবে বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু শিল্পবান্ধব হতে হবে-এটা ঠিক। তবে প্রশ্ন করলে পৃথিবীর সব রাজনৈতিক দলই বলবে-সরকার ওষুধের প্রশ্নে জনগণের পক্ষেই থাকবে। আমরাও অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে স্পষ্টভাবে জনগণের পক্ষেই আছি। আমরা হোস্টাইল হতে চাই না। শুধু এটুকু বলতে পারি-বিজ্ঞানসম্মত, বিশ্বের অভিজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে, যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায়সঙ্গত মুনাফার সুযোগ রেখে মানুষের জন্য ওষুধের দাম নির্ধারণ করতে চাই।
মঙ্গলবার বিকালে রাজধানীর শাহবাগের আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে ‘স্বাস্থ্য সেবায় গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় স্বাস্থ্য সচিব মো. সাইদুর রহমান এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফরসহ পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, সরকার ওষুধের দাম নির্ধারণে উদপাদন, গবেষণা খরচ, খুচরা বিক্রেতার কমিশন, শিল্প সম্প্রসারণের বিনিয়োগসহ সার্বিকভাবে শিল্পটির প্রয়োজনীয় বিকাশ হয়। একইসঙ্গে ন্যায্যমূল্যের প্রয়োজনীয় সুযোগ রেখে জনগনের জন্য ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিতে মানসম্মত বন্দোবস্ত রাখতে চাই। এখানে অবশ্যই ওষুধ শিল্পের বিকাশের জন্য ন্যায়সম্মত মুনাফার সুযোগ থাকবে। এজন্য বিশ্বের সেরা বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কৌশলগুলো তৈরি করবো। আমরা কোন শিল্প, ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি হোস্টাইল না।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে গিয়ে বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন দাতা নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে হ”েছ। এতে সাময়িক কিছু বিঘ্ন ঘটলেও আগামী দেড়-দুই মাসের মধ্যেই পরি¯ি’তি স্বাভাবিক হবে। দেশ স্বাধীনভাবে স্বাস্থ্যসেবা চালাতে সক্ষম হবে।
আইসিইউ সেবার দূরবস্থা প্রসঙ্গে বিশেষ সহকারী জানান, দীর্ঘদিন পরিকল্পনার অভাবে আইসিইউ-সংক্রান্ত জনবল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এবার বিএমইউতে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে ইমার্জোন্সী মেডিসিন এবং এবং জেরিয়াট্রিক মেডিসিনে নতুন দুটি সাবজেক্ট চালু করা হবে। একইসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, অ্যাম্বুলেন্স সেবার ক্ষেত্রেও অনিয়ম রয়েছে। সিন্ডিকেটের দখলে চলে যাওয়া অ্যাম্বুলেন্সগুলোর অধিকাংশই মানসম্মত নয়। সঠিক মানদণ্ড প্রয়োগ করলে বর্তমানে দেশে বিদ্যমান অ্যাম্বুলেন্সের ১০ শতাংশও টিকবে না।
চিকিৎসকদের ফি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনো পেশাগত ফি নির্ধারিত হয়নি। দরিদ্র রোগীর স্বার্থে চিকিৎসকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। তবে মূল সমস্যা হলো রেফারেল সিস্টেম না থাকায় রোগীরা সরাসরি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন, এতে খরচ অকারণে বেড়ে যা”েছ।
রাজধানীতে চিকিৎসকদের গড় মাসিক বেতন এখনো মাত্র ৩০ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা পেশায় আসলেও স্বল্প বেতন ও সীমিত সুযোগ-সুবিধার কারণে এই পেশার আকর্ষণ দ্রুত কমে যাচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী বলেন, আমাদের দেশে একটা ধারণা আছে যে মেধাবী ছেলেরা ডাক্তারি পড়ে। আগে এটি পুরোপুরি সত্য ছিল, এখনও অনেকটা সত্য। কিন্তু চিকিৎসা পেশায় থেকে টিকে থাকার জন্য যে সুবিধা প্রয়োজন তা নেই। আমেরিকা-ইউরোপে চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ আয়ের পেশাজীবীদের মধ্যে থাকলেও, বাংলাদেশে একজন চিকিৎসকের গড় বেতন এখনো মাত্র ৩০ হাজার টাকা। ফলে এ পেশাকে আকর্ষণীয় মনে না করার অন্যতম কারণ হচ্ছে বেতনের এই বৈষম্য।
তিনি আরও বলেন, সরকারি চাকরিতে চিকিৎসকদের বেতন যদি অন্তত ৬০ হাজারে উন্নীত করা যায়, তবে বেসরকারি খাতও বাধ্য হবে অন্তত ৫০ হাজার দিতে। বর্তমানে স্বাস্থ্য সেবাকর্মী ডাক্তার-নার্সদের অনেকেই ১২ হাজার টাকা বেতনে কাজ করছেন, যা পেশা পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতে ক্যাডার ব্যবস্থার বৈষম্য নিয়েও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার মতে, বিভিন্ন সরকারি ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত অবস্থায় রয়েছেন স্বাস্থ্য ক্যাডারের চিকিৎসকরা। সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি করে কিছুটা সমাধানের চেষ্টা করা হলেও, সেটি সামগ্রিক চিত্র পাল্টানোর মতো নয়।
নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রসঙ্গে বিশেষ সহকারী বলেন, কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে বঞ্চিত করার সুযোগ নেই। শর্ত পূরণ না করলে কেবল বাদ পড়তে হয়। বর্তমানে নিয়োগ প্রক্রিয়া এমন প্রতিষ্ঠান দিয়ে করা হচ্ছে, যাদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে।