নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের প্রায় ৫ কোটি মানুষের কোনো না কোনো ধরনের সহায়ক উপকরণ যেমন হুইলচেয়ার, কৃত্রিম অঙ্গ, শ্রবণযন্ত্র বা হাঁটার যন্ত্রের প্রয়োজন ūহলেও, এর মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ এই সেবা পান। অথচ উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এই হার প্রায় ৯০ শতাংশ। পুনর্বাসন সেবা ও সহায়ক প্রযুক্তি ছাড়া সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা।
এ বাস্তবতায় প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে সহায়ক প্রাপ্তিতে সরকারি তদারকি এবং স্বাস্থ্যখাতে পুনর্বাসন সেবাকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সোমবার রাজধানীর মিরপুরে সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অবদ্য প্যারালাইজড (সিআরপি)-তে অনুষ্ঠিত আইসিআরসি-সিআরপি’র যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক প্রযুক্তির ভূমিকা তুলে ধরা এবং পুনর্বাসন সেবা বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা জোরদারের লক্ষ্যে আজ মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) একটি বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করেছে সিআরপি ও ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অফ দ্য রেড ক্রস (আইসিআরসি)।
এই সেমিনারে ৩০০ জনেরও বেশি অংশগ্রহণকারী উপস্থিত থাকবেন, যাদের মধ্যে থাকবেন স্বাস্থ্য পেশাজীবী, নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, এনজিও, দাতা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতিনিধি। অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিনিময়, মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় পুনর্বাসন সেবা শক্তিশালীকরণে উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন বিভিন্ন খাতে সফলতার সাথে কাজ করে যাওয়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. রেজাউল করিম বলেন, স্বাভাবিক জীববযাপনের জন্য আমাকে ৮ থেকে ১০টা ডিভাইসের সহায়তা নিতে হয়। এই অ্যাসিস্টিভ টেকনোলজিগুলো যদি না পেতাম, তাহলে আজকে এই অবস্থায় আসতে পারতাম না। তবুও অনেক সময় নানা পর্যায়ে আটকাতে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এই টেকনোলজিগুলো নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কথা। কিন্তু তারা তা করে না। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে নামেমাত্র কিছু পণ্য দেওয়া হয়। অথচ এটি আমাদের মানবিক অধিকার।”
শ্রবণ প্রতিবন্ধী মো. আব্দুল্লাহ নিজের সামাজিক ও ব্যক্তিজীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, “নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞরা যদি সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ না জানেন, তাহলে শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের চিকিৎসা দেবেন কীভাবে?”
তিনি জানান, কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় কোনো সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ এক্সপার্ট পাননি, তবুও কঠোর পরিশ্রমে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন। “স্মার্টফোনের বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে আমি সারা বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত আছি, কিন্তু গ্রামের শ্রবণ প্রতিবন্ধীরা এই সুযোগ পাচ্ছে না,” উল্লেখ করে তিনি সরকারের কাছে শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য ইন্টারনেট বিল কমানো এবং এয়ার রিংয়ের মতো সহায়ক ডিভাইস বিনামূল্যে দেওয়ার আহ্বান জানান।
সেন্টার ফর ডিজ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের (সিডিডি) জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক মো. শারিফুল ইসলাম বলেন, “দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়ার পরও স্বাভাবিকভাবে মোবাইল ব্যবহার করি। আমরা বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করি। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ নিয়ে আমরা হতাশ। চিকিৎসকরা অনেক সময় বলেন, আর কিছু করার নেই। অথচ কাউন্সেলিং ও সাপোর্ট পেলে আমরাও ভালো কিছু করতে পারি।”
নিজের জীবনের গল্প তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি এবং আমার স্ত্রী দুইজনই অন্ধ। আমাদের বড় ছেলে উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়ায়, আর ছোট ছেলে এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। আমরা সুখী দম্পতি—আমরা নিজেরাই কাজ করি, একে অপরের পাশে থাকি।”
বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশনাল ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. মিজানুর রহমান হাটাচলায় অক্ষম হয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, “প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন ও সেবা বিষয়টি স্বাস্থ্য খাতের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে এই বিষয়টি নিশ্চিত না হলে প্রকৃত পরিবর্তন আসবে না।
বাংলাদেশ জাতীয় প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের সদস্য শরিফুল ইসলাম বলেন, “প্রয়োজনীয় ডিভাইসের অপ্রতুলতা আমাদের জন্য বড় বাধা। অন্যান্য দেশের খেলোয়াড়রা উন্নত মানের ডিভাইস ব্যবহার করছে, অথচ আমরা তা পাচ্ছি না। সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।